Gmail হ্যাক করে ব্যাংক হিসাব খালি, কোটি টাকার সাইবার প্রতারণা চক্রের মূলহোতা ইকবালসহ গ্রেপ্তার ২।
নিজ্জ্বল সাহা
স্টাফ রিপোর্টার,
চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি।
চট্টগ্রামে সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে চক্রটির মূলহোতা মো. ইকবালসহ দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তারকৃতরা ভুক্তভোগীদের Gmail ও বিভিন্ন অনলাইন অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) হিসাব থেকে অর্থ আত্মসাৎ করত। পরে সেই অর্থ অনলাইন জুয়া, গরুর ব্যবসাসহ বিভিন্ন অবৈধ খাতে বিনিয়োগ করা হতো বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ৭ এপ্রিল বিকেলে সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা এলাকার মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন তার দোকানে অবস্থানকালে ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর মোবাইল চালু হলে তিনি দেখতে পান তার ব্যবহৃত বিকাশ, নগদ ও বিভিন্ন ব্যাংকিং অ্যাপস মোবাইল থেকে উধাও হয়ে গেছে।
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার ইউসিবি ব্যাংকের একাধিক হিসাব থেকে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং বিকাশ-নগদ নম্বরে স্থানান্তর হয়ে যায়। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং নিশ্চিত হন যে তিনি একটি সুপরিকল্পিত সাইবার প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
ঘটনার পর সাতকানিয়া থানায় মামলা দায়ের করা হলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তদন্তে নামে। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতারক চক্রটির কার্যক্রম ও সদস্যদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে চক্রটির প্রধান মো. ইকবালসহ দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি ল্যাপটপ, চারটি মোবাইল ফোন, ১৮টি বিকাশ নিবন্ধিত সিম, আটটি ব্যাংক চেক বই, তিনটি ব্যাংক কার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, প্রতারক চক্রটি প্রথমে ভুক্তভোগীদের Gmail ও অন্যান্য অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করত। এরপর ব্যাংকিং ও MFS অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে বিকাশ, নগদসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অর্থ স্থানান্তর করত। আত্মসাৎকৃত অর্থ একাধিক ধাপে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে সরিয়ে লেনদেনের উৎস গোপন করা হতো। পরে সেই অর্থ অনলাইন জুয়া, গরুর ব্যবসা এবং অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হতো।
পুলিশ জানায়, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে। চক্রটির প্রধান ইকবালের বিরুদ্ধে ফেনী ও নোয়াখালী জেলায় একই ধরনের সাইবার প্রতারণার একাধিক মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া আরেক সদস্য রুবেলের বিরুদ্ধেও প্রতারণা সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। চক্রটির পলাতক সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা যায়, প্রতারকরা দেশের বিভিন্ন এলাকার সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে এক থেকে দুই হাজার টাকার বিনিময়ে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব ও সিম সংগ্রহ করত। এসব হিসাব ব্যবহার করে অবৈধ অর্থ লেনদেন সম্পন্ন করা হতো। পরে বিভিন্ন স্থান থেকে অর্থ ক্যাশ-আউট করে ব্যবসায়িক খাতে বিনিয়োগ করা হতো।
এদিকে সাইবার প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। বিশেষ করে Gmail, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যাংকিং ও MFS অ্যাকাউন্টে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (2FA) চালু রাখা, OTP ও PIN গোপন রাখা এবং অচেনা লিংক বা রিমোট অ্যাক্সেস অ্যাপ ব্যবহারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাহকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফেইস ভেরিফিকেশন, ফিঙ্গারপ্রিন্ট অথেনটিকেশন ও ডিভাইস ভেরিফিকেশনসহ বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, ডিজিটাল প্রতারণা প্রতিরোধে জনসচেতনতাই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কোনো ব্যক্তি সাইবার অপরাধ বা অনলাইন প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এই সংস্করণটি পত্রিকার ক্রাইম/আইন-শৃঙ্খলা পাতার উপযোগী করে সম্পাদনা করা হয়েছে, যেখানে তথ্যগুলো ধারাবাহিকভাবে সাজানো হয়েছে এবং সংবাদভাষার গাম্ভীর্য বজায় রাখা হয়েছে।