কুড়িগ্রামে গণশুনানিতে জনতার কথা শুনছে প্রশাসন, সেবার দুয়ারে নতুন আস্থার বার্তা
মোঃ জাফর আহমেদ কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতাঃ
প্রশাসনের দপ্তরে গিয়ে দিনের পর দিন ঘুরে বেড়ানো নয়—এবার নিজেদের অভিযোগ, সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা সরাসরি জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন কুড়িগ্রামের সাধারণ মানুষ। জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া, প্রশাসনের সঙ্গে নাগরিকদের দূরত্ব কমানো এবং সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতি বুধবার নিয়মিত সাপ্তাহিক গণশুনানির আয়োজন করছে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন।
গণশুনানিতে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শতাধিক সেবা-প্রত্যাশী মানুষ তাঁদের নানা সমস্যা, অভিযোগ ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি আবেদন ও অভিযোগ শোনেন। প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দিকনির্দেশনা দেন।
প্রশাসনের এমন সরাসরি জনসম্পৃক্ত উদ্যোগে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে আস্থার নতুন পরিবেশ। সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা কিংবা এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘোরার যে অভিযোগ বহুদিনের, গণশুনানির মাধ্যমে সেই সংস্কৃতির পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে জেলা প্রশাসন।
বিশেষ করে প্রত্যন্ত চরাঞ্চল, নদীভাঙনকবলিত এলাকা ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য প্রশাসনের দরজা উন্মুক্ত রাখার এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। শুধু দাপ্তরিক কাগজপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বিভিন্ন সময়ে নদীভাঙন ও চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের কথাও সরেজমিনে গিয়ে শুনেছেন। এতে প্রশাসনের প্রতি প্রান্তিক মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
জেলা প্রশাসনের এই গণশুনানির মূল লক্ষ্য শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়; বরং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নাগরিক সেবার মান উন্নত করা। একজন নাগরিক যেন নিজের ন্যায্য অধিকার ও সরকারি সেবা পেতে অযথা ভোগান্তির শিকার না হন—এ লক্ষ্যেই এমন উদ্যোগকে নিয়মিত কার্যক্রমে পরিণত করা হয়েছে।
সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জনগণের কথা শোনার কোনো বিকল্প নেই। আর সেই জায়গা থেকেই কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের সাপ্তাহিক গণশুনানি একটি প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে। কারণ, একজন জেলা প্রশাসক যখন সরাসরি সাধারণ মানুষের সামনে বসে তাঁদের কথা শোনেন, তখন প্রশাসন আর দূরের কোনো প্রতিষ্ঠান থাকে না; বরং মানুষের সমস্যা সমাধানের নির্ভরযোগ্য জায়গা হিসেবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
কুড়িগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য, নদীভাঙন, চরাঞ্চলের দুর্গমতা, কর্মসংস্থানের সংকটসহ নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আসছে। এমন বাস্তবতায় জনবান্ধব প্রশাসন শুধু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কণ্ঠস্বর প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় পৌঁছে দেওয়াও জরুরি। গণশুনানি সেই সুযোগটিই তৈরি করছে।
জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথের নেতৃত্বে জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং জনসেবার গুণগত মান বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি প্রশংসার দাবি রাখে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার মাধ্যমে তিনি প্রশাসনের দায়িত্বশীল ও মানবিক ভূমিকার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন।
তবে সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশা, গণশুনানিতে উত্থাপিত অভিযোগ শুধু শোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রতিটি যৌক্তিক অভিযোগের নিষ্পত্তির অগ্রগতি নিয়মিত তদারক করা হবে। অভিযোগ গ্রহণ থেকে সমাধান পর্যন্ত একটি কার্যকর ফলোআপ ব্যবস্থা চালু করা গেলে গণশুনানি আরও শক্তিশালী জনসেবা প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে।
প্রশাসন ও জনগণের সম্পর্কের ভিত্তি হলো আস্থা। সেই আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন সাধারণ মানুষ অনুভব করেন—তাঁদের কথা শোনার মতো কেউ আছেন এবং তাঁদের সমস্যার সমাধানে প্রশাসন আন্তরিক। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের নিয়মিত গণশুনানি সেই আস্থার জায়গাটিই শক্তিশালী করছে।
জনগণের কথা শোনা, সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সমাধানের জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া,একটি জনবান্ধব প্রশাসনের এ তিনটি বৈশিষ্ট্যই গণশুনানির মাধ্যমে দৃশ্যমান হচ্ছে। কুড়িগ্রামের উন্নয়ন অভিযাত্রায় এমন উদ্যোগ শুধু প্রশাসনিক কর্মসূচি নয়, বরং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি মানবিক ও প্রশংসনীয় প্রয়াস।