৩০০-এর বেশি পুকুরের গ্রাম, মাছেই বদলে গেছে মানুষের ভাগ্য
রাজারহাটের হরিশ্বর তালুক
জাফর আহমেদ, কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতাঃ
একসময় যেখানে ছিল ডোবা, বিল আর দারিদ্র্যের দীর্ঘশ্বাস, এখন সেখানেই সারি সারি পুকুর। বাড়ির চারপাশে পানি, পানিতে মাছ, আর মাছকে ঘিরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের কর্মচাঞ্চল্য। কেউ নৌকায় করে মাছের খাবার দিচ্ছেন, কেউ জাল টানছেন, কেউ মাছ তুলে ছুটছেন আড়তের দিকে। মাছ চাষকে কেন্দ্র করে বদলে গেছে একটি গ্রামের অর্থনীতি। পাকা বাড়ি উঠেছে, সন্তানরা পড়ছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, তৈরি হয়েছে সারা বছরের কর্মসংস্থান। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার হরিশ্বর তালুক এখন মাছ চাষে ভাগ্য বদলের এক অনন্য উদাহরণ।
রাজারহাট উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে হরিশ্বর তালুক গ্রামের অবস্থান। কয়েক বছর আগেও গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা ছিল ডোবা ও বিল। এখন সেই জমির বড় অংশজুড়ে মাছের পুকুর। গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়ে একের পর এক পুকুর। কোনোটি ছোট, কোনোটি মাঝারি, আবার কোনোটি এত বড় যে দূর থেকে দেখলে মনে হয় বিল। অধিকাংশ বাড়িই যেন পুকুর দিয়ে ঘেরা।
স্থানীয় মাছচাষিদের হিসাবে, গ্রামে তিন শতাধিক পুকুর রয়েছে। প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ জন বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করছেন। মাছ চাষের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে প্রায় দেড় হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা। চাষিদের দাবি, বছরে এখানে প্রায় ২ হাজার ৬৩৩ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। প্রতি কেজি মাছ গড়ে ১৪৫ টাকা দরে বিক্রি হলে বছরে এসব মাছের বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩৮ কোটি ১৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
তবে সরকারি হিসাবে চিত্রটি ভিন্ন। রাজারহাট উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ডোবা ও অন্যান্য জলাশয় বাদে হরিশ্বর তালুক গ্রামে পুকুর রয়েছে ২১১টি। এসব পুকুরে বছরে মাছ উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৭০৩ মেট্রিক টন। ফলে মাছ উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ে স্থানীয় চাষিদের দাবি ও সরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। এই ব্যবধানের কারণও স্পষ্ট নয়।
তবে হিসাবের এই পার্থক্য হরিশ্বর তালুকের বাস্তব পরিবর্তনকে আড়াল করতে পারে না। সরেজমিনে দেখা যায়, মাছকে ঘিরে এখানে তৈরি হয়েছে একটি বড় কর্মযজ্ঞ। পুকুরে মাছের খাবার দেওয়া থেকে শুরু করে মাছ ধরা, পরিবহন, আড়তে বিক্রি—প্রতিটি ধাপেই কাজ করছেন গ্রামের মানুষ। নারী-পুরুষ উভয়েই যুক্ত রয়েছেন এই কাজে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাছ চাষের আওতায় থাকা প্রায় ৭০ শতাংশ পুকুর মূলত ধানি জমি ছিল। এসব জমিতে বছরে একবার বোরো ধান চাষ হয়। বাকি সময় সেখানে চলে মাছের চাষ। অন্যদিকে স্থায়ী পুকুরগুলোতে সারা বছরই মাছ চাষ করা হয়।
গ্রামে রয়েছে শতাধিক বড় পুকুর, প্রায় ৯০টি মাঝারি পুকুর এবং অসংখ্য ছোট পুকুর। একেকটি পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একাধিক পরিবারের আয়-রোজগার। মাছের খাবার বিক্রেতা, পোনা সরবরাহকারী, জেলে, পাহারাদার, ভ্যানচালক ও শ্রমিক—সবাই কোনো না কোনোভাবে উপকৃত হচ্ছেন এই মাছের অর্থনীতি থেকে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, হরিশ্বর তালুক মূলত একটি বড় দোলা বা বিলের পাশে অবস্থিত। একসময় এখানে মানুষের বসতি ছিল তুলনামূলক কম। কৃষিকাজই ছিল অধিকাংশ মানুষের প্রধান অবলম্বন। দারিদ্র্য ছিল অনেক পরিবারের নিত্যসঙ্গী।
২০০০ সালের দিকে ইলিয়াস আলী নামের এক ব্যক্তি প্রথম ধানি জমিতে মাছ চাষ শুরু করেন। শুরুতে তার উদ্যোগ ছিল ব্যতিক্রমী। কিন্তু মাছ চাষে সাফল্য পাওয়ার পর অন্যরাও উৎসাহিত হন। একজনের সাফল্য দেখে আরেকজন, তারপর আরেকজন—এভাবেই ধীরে ধীরে মাছ চাষ ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে।
এরপর চাষিরা প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। মাছের পোনা নির্বাচন, খাবার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও পুকুর পরিচর্যায় আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করেন অনেকে। ধানি জমি পরিণত হয় মাছের পুকুরে। বাড়তে থাকে পুকুরের সংখ্যা, বাড়ে চাষির সংখ্যাও। মাছ চাষ হয়ে ওঠে অনেক পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস।
সফল মাছচাষিদের একজন শাহ আলম। তার তিনটি বড় পুকুরের মোট আয়তন ২৩ একর। তিনি জানান, এসব পুকুরে কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছেন। বছরে আয় করেন প্রায় ১৫ লাখ টাকা।
আরেক মাছচাষি আবুল কালাম আজাদ জানান, তিনি বছরে এক কোটি টাকার বেশি মূল্যের মাছ বিক্রি করেন। তার ভাষ্য, মাছ চাষের কারণে শুধু পুকুরের মালিকরাই লাভবান হচ্ছেন না; পাহারাদার, জেলে, ভ্যানচালক, মাছের খাবার ও ওষুধ সরবরাহকারী শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ কাজের সুযোগ পেয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রায় এক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
মাছচাষি আলতাফ হোসেন বলেন, স্থানীয় মৎস্য বিভাগের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পেলেও বিভিন্ন ফিড কোম্পানির প্রতিনিধিরা এলাকায় এসে প্রশিক্ষণ দেন। এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা মাছ চাষের আধুনিক কলাকৌশল সম্পর্কে জানতে পারছেন এবং তা কাজে লাগাচ্ছেন।
তবে মাছ চাষিদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। মাছের খাবার, ওষুধ ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। কয়েকজন চাষি জানান, উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে মাছের দাম সব সময় সে অনুযায়ী বাড়ছে না। ফলে আগের তুলনায় লাভের অঙ্ক কিছুটা কমেছে।
রাজারহাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এমাদুল হক জানান, রাজারহাট উপজেলায় পাঁচ হাজারের বেশি পুকুর রয়েছে। আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে হরিশ্বর তালুকের চাষিরা সফল হয়েছেন। তাদের সুনাম এখন পুরো কুড়িগ্রাম জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশিক্ষণসহ মৎস্য বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
একসময় যে গ্রামে দারিদ্র্য ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা, সেই গ্রামেই এখন মাছের পুকুর ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন অর্থনীতি। পুকুরের পানিতে শুধু মাছ উৎপাদন হচ্ছে না, তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান, বাড়ছে আয়, বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রা।
হরিশ্বর তালুকের এই পরিবর্তন দেখিয়ে দিয়েছে, সঠিক উদ্যোগ ও আধুনিক পদ্ধতি কাজে লাগাতে পারলে গ্রামের অনুৎপাদনশীল বা কম ব্যবহৃত জমিও হয়ে উঠতে পারে অর্থনীতির বড় উৎস। তবে চাষিদের হিসাব ও সরকারি পরিসংখ্যানের বড় ব্যবধানটি নিরসন করে প্রকৃত উৎপাদনের তথ্য নিরূপণ করা জরুরি। পাশাপাশি মাছের ন্যায্য দাম, উৎপাদন উপকরণের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, সহজ শর্তে ঋণ ও আধুনিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে হরিশ্বর তালুকের এই সাফল্য আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।