শিক্ষার্থীদের অদৃশ্য লড়াই ও মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট: প্রয়োজন এক সহমর্মী ক্যাম্পাস
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মনে জমে থাকা দীর্ঘদিনের না-বলা কথা, ক্ষোভ, হতাশা এবং প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাদের নানা অভিব্যক্তিতে। পড়াশোনার প্রচণ্ড চাপ, পারিপার্শ্বিক পরিবেশের টানাপোড়েন এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ছাপিয়ে আজ বড় হয়ে উঠেছে মনের যত্ন নেওয়ার বিষয়টি। শারীরিক অসুস্থতা প্রকাশ পেলেও মানসিক কষ্টগুলো কীভাবে নীরবে একজন শিক্ষার্থীকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয় তার এক বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে সবার কথায়। আর এই প্রতিটি লেখার অন্তর্নিহিত সুর ও ভাবনাগুলো সুচারুভাবে একসঙ্গে গেঁথে তুলে ধরেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ উদ্দিন।
ক্যাম্পাসের ভৌত পরিবেশ ও মানসিক শান্তির সংকট
লেখা: হামিম শেখ, শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই মানসিক স্বাস্থ্যও সমান অপরিহার্য, কারণ মন ভালো না থাকলে পড়াশোনা, সম্পর্ক, এমনকি শরীরও ভেঙে পড়ে। শরীর অসুস্থ হলে আমরা ডাক্তারের কাছে যাই, কিন্তু মনের কষ্ট অনেক সময় চেপে রাখি, অথচ সেটাই ধীরে ধীরে আমাদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। আমাদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান পুরান ঢাকায়, যেখানে সমস্যার শেষ নেই। চারপাশে বদ্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ক্যাম্পাসের আশপাশে নিম্নমানের খাবার, সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের শরীর ও মনের ওপর প্রতিনিয়ত চাপ পড়ছে। সারাদিন ক্লাস শেষে একটু নির্মল পরিবেশে নিশ্বাস নেওয়ার জায়গাটুকুও আমরা পাই না। আমাদের ক্যাম্পাসটাও আকারে বেশ ছোট, তবু পরিচ্ছন্নতার দিকে যথেষ্ট নজর দেওয়া হয় না। অনেক সময় ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় তৈরি হয়ে যায়, যা মানসিক প্রশান্তিও নষ্ট করে। প্রশাসনের কাছে আমার বার্তা, ক্যাম্পাসটি নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং যেখানে-সেখানে আবর্জনা জমতে না দিতে বিশেষ নজর দিতে হবে। আমাদের মতো ছোট ক্যাম্পাসে ফুলের গাছ লাগাতে হবে, কারণ সুন্দর ও সবুজ পরিবেশই শিক্ষার্থীদের মানসিক পরিতৃপ্তি এনে দিতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, তাই ক্যান্টিনের খাবারের মান উন্নত করতে এবং নিয়মিত তদারকি করতে হবে। ক্যাম্পাসে বিশুদ্ধ ও নিরাপদ খাবার পানির সুব্যবস্থা থাকা শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার, তাই এ বিষয়ে প্রশাসনকে অবশ্যই আন্তরিক হতে হবে। একই সাথে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে ফগার মেশিনের মাধ্যমে নিয়মিত স্প্রে করতে হবে, যাতে আমরা নিশ্চিন্তে ক্যাম্পাসে সময় কাটাতে পারি। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে নিয়মিত সেমিনার, কর্মশালা বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে কেউ মনের কথা বলতে সংকোচ না করে। কারণ সুস্থ পরিবেশ আর সচেতন মনই পারে একটি সুন্দর ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে।
অব্যক্ত অবসাদ ও অকাল বিদায়ের বেদনা
লেখা: তামান্না ফেরদৌসী, শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
একটি ভাঙা মন নিয়ে আর যাই হোক, অন্তত বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকা যায় না.. আর এই কঠিন সত্যটিই আজ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রাণের উপলব্ধি। সম্প্রতি ক্যাম্পাসের চারুকলা অনুষদের মেধাবী শিক্ষার্থী অনিক চন্দ্র পালের অকাল ও বেদনাদায়ক বিদায় জবিয়ানদের মনে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। যে হাত ক্যানভাসে রঙের জাদুতে জীবন ফুটিয়ে তুলত, সেই হাতই এক বুক নীরব অভিমান আর তীব্র মানসিক অবসাদের কাছে হেরে গিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। এই নির্মম ট্র্যাজেডি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, শরীর ভালো থাকলেও যদি মন বিষণ্ণতার অতল গহ্বরে তলিয়ে যায়, তবে জীবনই থমকে যায়। বেঁচে থাকার জন্য এবং স্বপ্নের আঙিনায় ডানা মেলার জন্য একটি সুস্থ মন সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে জবি প্রশাসনের প্রতি শিক্ষার্থীদের আকুল আবেদন ক্যাম্পাসে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও নিবিড় কাউন্সিলিং সেবা আরও জোরদার করা হোক। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য পেশাদার মানসিক সহায়তা পাওয়ার পথকে সম্পূর্ণ সংকোচহীন, সহজলভ্য ও আন্তরিক করে তোলা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসন যদি প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনের নীরব হাহাকার শোনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং অবসাদ দূর করতে নিয়মিত মনস্তাত্ত্বিক সেমিনারের আয়োজন করে, তবে আর কোনো প্রাণ এভাবে অকালে ঝরে পড়বে না।
"মানসিক স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার" এই চিরন্তন সত্যকে ধারণ করে জবি প্রশাসন শিক্ষার্থীদের মানসিক সুরক্ষায় দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রতিটি জবিয়ানের বুকভরা প্রত্যাশা।
হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নীরব হাহাকার
লেখা: নুসাইবা আনজুমান, শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, সুস্থ থাকার অর্থ শুধু শারীরিকভাবে ভালো থাকা নয়, বরং মানসিকভাবেও ভালো থাকা। আমরা শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং ব্যক্তিগত নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাই। অনেক সময় বাইরে থেকে আমাদের স্বাভাবিক ও হাসিখুশি মনে হলেও ভেতরে ভেতরে আমরা কতটা মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তা কেউ বুঝতে পারে না। কখনো ভালো ফলাফলের প্রত্যাশা, কখনো পরিবারের স্বপ্ন পূরণের চাপ, আবার কখনো নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আমাদের নীরবে ক্লান্ত করে তোলে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও অনেকে নিজের অনুভূতির কথা কাউকে বলতে পারে না; যদি কেউ দুর্বল ভাবে, সেই ভয়ও কাজ করে। অথচ আমাদেরও মন খারাপ হয়, হতাশা আসে, কখনো একটু সহমর্মিতা আর নির্ভরতার প্রয়োজন হয়। যদি আমি নিজের ব্যক্তিগত জীবনের কথা বলি , তাহলে কিছুদিন আগেও আমি মানসিক চাপে ছিলাম যে কারণে খুব বাজে চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল । আল্লাহর ইবাদত করে, ব্যক্তিগত কাউন্সিলিং, বন্ধুদের সাহায্যে আলহামদুলিল্লাহ অনেকটাই সুস্থ আছি এখন। আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আমার অনুরোধ, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে যেন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে সহজলভ্য ও গোপনীয় কাউন্সেলিং সেবা চালু করা, নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম আয়োজন করা এবং শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। আমি চাই, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা হয়ে উঠুক, যেখানে একজন শিক্ষার্থী শুধু ভালো ফলাফল করার জন্য নয়, মানুষ হিসেবেও ভালো থাকার সুযোগ পাবে। কারণ, প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাসির পেছনে যেমন স্বপ্ন থাকে, তেমনি কিছু না-বলা কষ্টও থাকতে পারে। সেই কষ্টগুলো বোঝার মতো একটি সহমর্মী পরিবেশই আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় অবহেলা, কুসংস্কার এবং জবিয়ান জীবনের জটিল বাস্তবতা
লেখা: ফারিহা মল্লিক, শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস, যা পালন করা হয় প্রতিবছর ১০ ই অক্টোবর। কিন্তু বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মাঝে আসলেই কি মূল বিষয়ে নজর দেওয়া হচ্ছে? পরিসংখ্যান বলে দেশের ৯২ শতাংশ মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বাইরে। এটা কি শুধু আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যাবস্থার সমস্যা না আমাদের নিজেদের সচেতনতার অভাব? বিষয় টা এমন না যে আমাদের চিকিৎসা খাতে মানসিক রোগের চিকিৎসা দেওয়ার মতো স্বয়ংসম্পূর্ণতা আছে আবার আমাদের দেশের বিভিন্ন কুসংস্কার, ওঝা, ঝাড়ফুঁক, কবিরাজ, অসচেতনতা'র আড়ালে মানসিক স্বাস্থ্য বা মানসিক সমস্যা বলতে যে বিষয়গুলো বোঝায় তা হারিয়ে যায়।
এবার আসি মানসিক সমস্যা বা মানসিক রোগ কিভাবে সৃষ্টি হয়। জন্ম থেকেই কেও এই ধরনের সমস্যা নিয়ে জন্মায় না। পৃথিবীর বিভিন্ন বিষয় অবলোকন করতে গিয়ে এবং বিভিন্ন অভিজ্ঞতার স্বীকার হতে হতে মানুষ এর নিজের ইচ্ছা বা নিজের নীতি বিরোধী অনেক কিছু যখন তার সামনে ঘটতে থাকে এবং যখন সে এই বিষয়গুলোকে আর ঠিক ভাবে মানিয়ে নিতে পারে না তখনই তার মানসিক সমস্যা শুরু হয় এবং এভাবে একটা পর্যায়ে যাওয়ার পর তার সমস্যা বিভিন্ন রোগ এ পরিণত হয় এবং তার চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
একজন বাংলাদেশি এবং দেশপ্রেমী হলে দেশের বিভিন্ন অবস্থা অবলোকন করতে গিয়ে মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় আবার যেহেতু আমি একজন জবিয়ান হিসেবে লিখছি তাই আমার এবং আমাদের ক্ষেত্রে বিষয় টা আরও জটিল। প্রশাসন কি করতে পারে বা পারবে এ বিষয়ে তা জানিনা তবে, আবেদন থাকবে যে, একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী হিসেবে যে সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো পাওয়ার কথা তার সব না হলেও যেন অধিকাংশ নিশ্চিত করে আমাদের পড়াশোনার যোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলা হয়। সর্বোপরি, এবারের মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে প্রত্যাশা থাকবে যেন একদম মূল থেকে সর্বোচ্চ পর্যন্ত সবাই যেন এ বিষয়ে সচেতন হতে পারি এবং করতে পারি আর নিজেরা ভালো থাকি এবং অপরকে ভালো রাখি।
মার্কশিটের ভিড়ে মানুষের অস্তিত্বের মূল্যায়ন
লেখা: অহিদুজ্জামান রোহান, শিক্ষার্থী, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষার্থীর হাতে বই থাকে, কাঁধে থাকে ভবিষ্যতের বোঝা, আর মনের ভেতর জমতে থাকে অসংখ্য অপ্রকাশিত গল্প।
পরীক্ষার খাতায় নম্বরের হিসাব হয়, কিন্তু সেই নম্বরের পেছনে হারিয়ে যাওয়া ঘুমের হিসাব কে রাখে?
একটি খারাপ ফলাফল কখনো কখনো একজন শিক্ষার্থীর কাছে নিজের যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অথচ একটি ফলাফল কখনোই একটি মানুষের সম্পূর্ণ সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি হতে পারে না।
আমরা শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করি, “ভবিষ্যতে কী হবে?” কিন্তু খুব কমই জিজ্ঞেস করি, “বর্তমানে কেমন আছো ?”
প্রতিযোগিতার এই পৃথিবীতে সবাইকে এগিয়ে যেতে বলা হয়, অথচ পিছিয়ে পড়লে পাশে থাকার মানুষ ক্রমেই কমে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্য দেখতে দেখতে অনেকেই নিজের জীবনের স্বাভাবিক গতিকেও ব্যর্থতা ভাবতে শুরু করে।
কেউ নীরব হয়ে যায়, কেউ অতিরিক্ত হাসে, কেউবা স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করতে করতেই ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
মনে রাখতে হবে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়া দুর্বলতার পরিচয় নয়; সাহায্য চাওয়া বরং নিজের প্রতি দায়িত্বশীলতার প্রকাশ।
একজন শিক্ষার্থীর প্রয়োজন শুধু ভালো শিক্ষক কিংবা উন্নত পাঠ্যক্রম নয়, প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে তার অনুভূতিও গুরুত্ব পায়।
যেখানে কান্না লুকাতে হয় না, ব্যর্থতা নিয়ে লজ্জিত হতে হয় না, আর নিজের কষ্ট প্রকাশ করার জন্য কাউকে বিচার সহ্য করতে হয় না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল মেধা তৈরির কারখানা নয়, বরং সুস্থ মানুষ গড়ে ওঠারও আশ্রয় হওয়া উচিত।
এই বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক, শুধু সাফল্যের গল্প শুনব না, সংগ্রামের গল্পগুলোকেও জায়গা দেব।
কারণ প্রতিটি শিক্ষার্থী প্রথমে একজন মানুষ, তারপর একজন পরীক্ষার্থী; তার অস্তিত্বের মূল্য কোনো মার্কশিটের চেয়ে বড়।
চলুন, এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলি, যারা শুধু ভালো ফলাফল করতে নয়, ভালো থাকতেও শিখবে।
প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব এবং সহমর্মিতাপূর্ণ পরিবেশের তাগিদ
লেখা: নাহিসা আক্তার ফাতেমা, শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, শারীরিক সুস্থতার মতো মানসিক সুস্থতাও আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ। কারণ একজন শিক্ষার্থী শুধু বই, পরীক্ষা কিংবা ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তারও নানা অনুভূতি, দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা ও ব্যক্তিগত লড়াই রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবন একদিকে যেমন স্বপ্ন পূরণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে, অন্যদিকে পড়াশোনার চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, পারিবারিক প্রত্যাশা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও সম্পর্কের টানাপোড়েন অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক শিক্ষার্থী নিজের ভেতরের কষ্টগুলো আড়াল করে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে, কারণ আমাদের সমাজে মানসিক সমস্যাকে এখনো অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আমার প্রত্যাশা, শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতাকে প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান কাউন্সেলিং সেবাকে আরও সহজলভ্য, পরিচিত ও কার্যকর করা হোক। একই সঙ্গে এমন একটি সহমর্মিতাপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে একজন শিক্ষার্থী বিচারিত হওয়ার ভয় ছাড়াই নিজের সমস্যার কথা বলতে পারবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবে। আমি বিশ্বাস করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু শিক্ষার্থীদের অর্জন কিংবা ফলাফলে নয়, বরং তারা কতটা সুস্থ, নিরাপদ ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারছে, তার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। শিক্ষার্থীদের মনের যত্ন নেওয়া কোনো অতিরিক্ত দায়িত্ব নয়; বরং তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।