
কটিয়াদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চরম অব্যবস্থাপনা ও রোগী হয়রানির অভিযোগ।
কটিয়াদী ক্রাইম রিপোর্টার আফজল হুসাইন।
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না দিয়ে প্রাইভেট চেম্বারে পাঠানোর অভিযোগ ডেন্টাল সার্জনের বিরুদ্ধে
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কটিয়াদী-এ চিকিৎসাসেবা নিয়ে চরম অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও রোগী হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা না দিয়ে প্রাইভেট চেম্বারে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে ডেন্টাল সার্জন ডা. মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম-এর বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালের আউটডোরে দাঁতের রোগী দেখালেও চিকিৎসা না দিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে রোগীদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় তার ব্যক্তিগত চেম্বার “এলিট ডেন্টাল সার্জারি”-তে। সেখানে এক্স-রে ও চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা।
রোগীর স্বজন তানহার মা, তামিমের নানী, কিরণ (১৮)সহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসার সব ধরনের সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও ডাক্তার খায়রুল ইসলাম ও ডেন্টাল টেকনোলজিস্ট বেবি মোদক রোগীদের চিকিৎসা না দিয়ে চেম্বারের ঠিকানা ও ফোন নম্বর লিখে দেন। দরিদ্র রোগীরা অর্থাভাবে প্রাইভেট চিকিৎসা নিতে না পেরে চিকিৎসাবঞ্চিত হচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ওই চেম্বারে নিয়মিত বসেন ডা. নাদিয়া আফরিন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চেম্বারটির ট্রেড লাইসেন্সের জন্য পৌরসভায় কোনো আবেদনও করা হয়নি।
উল্লেখ্য, গত ২৩ মার্চ ২০২৬ তারিখে “এলিট ডেন্টাল সার্জারি” চেম্বারটির উদ্বোধন করেন ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ শাহরিয়ার অনিকসহ কয়েকজন চিকিৎসক।
গোপন ক্যামেরায় ধরা পড়ল হাসপাতালের নৈরাজ্য
৭ মে ২০২৬ সকাল ১০টা ২২ মিনিটে গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কোনো মেডিকেল অফিসার বা নার্স উপস্থিত নেই। সেখানে ওয়ার্ড বয় রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছে। এমনকি একটি ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি চিকিৎসাকর্মীদের ওষুধের নাম বলে দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
একই দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার আউটডোরের অধিকাংশ কক্ষ ফাঁকা দেখা যায়। দীর্ঘ সময় রোগীরা টিকিট হাতে বসে থাকলেও ডাক্তারদের দেখা মেলেনি। ১১৪ নম্বর কক্ষ সকাল ১০টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত তালাবদ্ধ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালে ভর্তি এক শিশুর স্বজন অভিযোগ করেন, ভর্তি হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও কোনো ডাক্তার রোগী দেখতে আসেননি। শিশুটির মা বলেন, “জরুরি বিভাগ থেকে যে ওষুধ লিখে দিয়েছে তাই চলছে। আমার বাচ্চার অবস্থা ভালো না, আমি অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাব।”
জরুরি বিভাগে ডাক্তার অনুপস্থিত, প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন অন্যরা
৭ থেকে ১০ মে পর্যন্ত বিভিন্ন সময় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, কর্তব্যরত মেডিকেল অফিসার অনুপস্থিত থাকায় উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার ও নার্স রোগী দেখছেন এবং প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় ওয়ার্ড বয়রাও ইনজেকশন, স্যালাইন, ক্যানুলা ও ব্লাড প্রেসার পরীক্ষা করছেন।
সাধারণ রোগীরা অভিযোগ করেন, হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্টাফ নির্ধারিত পোশাক ব্যবহার না করায় কে ডাক্তার, কে নার্স আর কে ওয়ার্ড বয়—তা বোঝার উপায় থাকে না।
হাসপাতালজুড়ে দালাল ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্য
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সার্বক্ষণিক অবস্থান করতে দেখা যায়। একই সঙ্গে ক্লিনিকের দালালদেরও ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা রোগীদের বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
হাসপাতালের প্রধান ফটকের একাংশ দখল করে টং দোকান ও হকারদের বসতে দেখা গেছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ফল, পিঠাসহ বিভিন্ন খাবার বিক্রি হওয়ায় রোগী ও স্বজনদের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য মেলেনি
এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও ডা. সৈয়দ শাহরিয়ার অনিক-কে পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল সূত্র জানায়, তিনি ছুটিতে রয়েছেন।
হাসপাতালের আরএমও ডা. মোহাম্মদ ইসা খান-এর কাছে আউটডোরে ডাক্তারদের অনুপস্থিতি ও জরুরি বিভাগের অব্যবস্থাপনা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার জন্য অপেক্ষা করেন, না হলে আপনারা আপনাদের মতো নিউজ করেন।”
তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সরকারি হাসপাতালে এমন অনিয়ম ও রোগীদের প্রাইভেট চেম্বারে পাঠানোর অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।





