
কুড়িগ্রামে অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব: নদীভাঙনে নিঃস্ব মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-জনজীবন; প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি
কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতাঃ
কুড়িগ্রামের বিভিন্ন নদ-নদীতে দীর্ঘদিন ধরে অবাধে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদকে ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রভাবশালী চক্রের বালু বাণিজ্য। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তীব্র নদীভাঙনের শিকার হচ্ছে নদীপাড়ের হাজারো মানুষ। অন্যদিকে শত শত ট্রাক ও ট্রলির মাধ্যমে বালু পরিবহনের কারণে গ্রামীণ সড়কগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, দুর্ভোগে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
এই পরিস্থিতিতে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, নদীতীর রক্ষা এবং ভাঙনকবলিত মানুষের পুনর্বাসনের দাবিতে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শনিবার (৩০ মে) দুপুরে উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের ফকিরেরহাট চৌমনিবাজারে বিক্ষোভ মিছিল শেষে কালিকুড়া এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সহস্রাধিক নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করেন।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রভাবশালী একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছে। এর ফলে নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক আজ হুমকির মুখে।
বক্তারা জানান, ফকিরেরহাট থেকে কালিকুড়া ও কাঁচকোল পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় অন্তত ১২টি পয়েন্টে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলে স্থানীয়দের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও রাজনৈতিক মামলার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ ওঠে।
মানববন্ধনে আরও বলা হয়, নদীভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থাপিত পিসি ব্লক ও জিওব্যাগ পর্যন্ত অপসারণ করা হচ্ছে। ফলে নদীতীর রক্ষা কার্যক্রমও হুমকির মুখে পড়েছে।
বক্তারা অভিযোগ করেন, বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
মানববন্ধন থেকে অবিলম্বে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, অনিয়ন্ত্রিত ড্রেজিং নিষিদ্ধ, ফকিরেরহাট থেকে কাঁচকোল বাজার পর্যন্ত টেকসই বাঁধ নির্মাণ, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন, সরকারি সম্পদ অপসারণকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার দাবি জানানো হয়।
নীহারিকা শারমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য দেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রিভারাইন পিপলের পরিচালক তুহিন ওয়াদুদ, সফলতার শিকড় ফাউন্ডেশনের সভাপতি শাহজালাল মিয়া, প্রধান শিক্ষক রুহুল আমীন, ব্যবসায়ী মুকুল মণ্ডল, খন্দকার বদরুল ইসলাম, আশিক ইকবাল, ভুক্তভোগী আকতারা লিপি ও রফিকুল ইসলাম।
ভুক্তভোগী আকতারা লিপি বলেন, “অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে আমার বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন বাধ্য হয়ে নদীতীরের বাঁধের ওপর বসবাস করছি। আমার আর কোনো জমি বা আশ্রয়স্থল নেই।”
রিভারাইন পিপলের পরিচালক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, “নদীপাড়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে ব্রহ্মপুত্রে অবৈধ বালু উত্তোলন চলছেই। প্রশাসন জানার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।”
এদিকে কুড়িগ্রাম শহরসংলগ্ন ধরলা নদীপাড়ের বাসিন্দারা ভিন্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেছেন। তাদের দাবি, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নদী খননের মাধ্যমে উত্তোলিত বালু সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে তা আবার নদীতেই ফিরে গিয়ে ভরাট হয়ে যাবে। তাই স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য ও দায়িত্বশীল ইজারাদার নিয়োগ দিয়ে পরিবেশসম্মতভাবে বালু উত্তোলনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন, জেলার বিভিন্ন স্থানে টেন্ডারবিহীন অসংখ্য বালু উত্তোলন পয়েন্ট গড়ে উঠেছে, যেগুলো থেকে সরকার রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি পরিবেশ ও জনজীবনের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এসব অবৈধ পয়েন্ট চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সচেতন মহলের মতে, অবৈধ বালু উত্তোলন শুধু নদীভাঙনের কারণ নয়, এটি জেলার অবকাঠামো, কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নদী ও নদীপাড়ের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় অবিলম্বে কঠোর প্রশাসনিক অভিযান এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ সময়ের দাবি।





