শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০০ পূর্বাহ্ন [gtranslate]
ব্রেকিং নিউজঃ
লটারির আড়ালে ‘বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ; জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের পদায়নে ক্ষোভ শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে গয়হাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী জাকির তালুকদারের উদ্যোগে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে শুভেচ্ছা উপহার বিতরণ যশোরে উৎসব মুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো ‘শহীদ জিয়া স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬’-এর জমকালো ফাইনাল। নগরকান্দায় ৬৩ পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি, গুরুত্বপূর্ণ ৩টি পাঁচবিবিতে দুর্গাপূজা উপলক্ষে অসহায় নারীদের শাড়ি উপহার দিলেন এমপি মরহুম কোরবান আলীর মৃত্যুবার্ষিকীতে ইসলামপুর প্রেসক্লাবে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল কালিয়াকৈরে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা নড়াইলে মোটর সাইকেলের ধাক্কায় রঙ মিস্ত্রী মুক্তা রানী বিশ্বাসের মৃত্যু গাজীপুরে পুলিশ সুপারের বিভিন্ন থানার পূজা মন্ডপ পরিদর্শন -কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে সমুদ্রপথে নিখোঁজ মাদারীপুরের যুবক জাকির মাতুব্বর
বিজ্ঞপ্তিঃ
ব্রেকিং নিউজ*** দেশও বিদেশ খবর পেতে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন।*বিজয় ২৪ টিভি  খবর ও বিজ্ঞাপন প্রচার করতে  যোগাযোগ করুন:gmail :bijoy24tv2024@gmail.com* হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার ০১৭৪৩৮৮৯০৬৮।*সবার পাশে Bijoy 24 TV* আপনারা দেখছেন বিজয় ২৪ টিভি ধন্যবাদ।
মুসলিম সংস্কৃতি ও পাশ্চাত্যবাদ: দুই জীবনদর্শনের মুখোমুখি
/ ৪৫ Time View
Update : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১:০২ অপরাহ্ন

মুসলিম সংস্কৃতি ও পাশ্চাত্যবাদ: দুই জীবনদর্শনের মুখোমুখি

লেখিকা: মোর্শেদা রহমান মিতালি,
শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সভ্যতার ইতিহাস মূলত মানুষের নিজেকে, সমাজকে এবং পৃথিবীকে বোঝার এক দীর্ঘ অভিযাত্রার ইতিহাস। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষ তার জীবনকে সাজিয়েছে বিভিন্ন বিশ্বাস, মূল্যবোধ, দর্শন ও আদর্শের ভিত্তিতে। কখনো ধর্ম তার পথপ্রদর্শক হয়েছে, কখনো যুক্তি ও বিজ্ঞানের আলো তাকে নতুন দিগন্তের সন্ধান দিয়েছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় মুসলিম সংস্কৃতি ও পাশ্চাত্যবাদ বিশ্বসভ্যতার ওপর গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছে।

এই দুই সংস্কৃতির পার্থক্য কেবল পোশাক, খাদ্যাভ্যাস কিংবা সামাজিক রীতিনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা নিহিত রয়েছে মানুষের অস্তিত্বের অর্থ, জীবনের উদ্দেশ্য, নৈতিকতার ভিত্তি, পরিবার, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, অর্থনীতি, রাষ্ট্র এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে। ইসলামী জীবনদর্শন মানুষের পার্থিব জীবনকে আখিরাতের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত করে দেখে। অন্যদিকে আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তা ব্যক্তিস্বাধীনতা, যুক্তিবোধ, মানবাধিকার, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং পার্থিব কল্যাণকে সামাজিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে।

জ্ঞানের আলো কোথা থেকে আসে?

মুসলিম সংস্কৃতির জ্ঞানতত্ত্বের কেন্দ্রে রয়েছে ওহি। কোরআন ও সুন্নাহ মুসলমানের জীবন, নৈতিকতা ও আচরণের মৌলিক পথনির্দেশনা প্রদান করে। তবে ইসলামী চিন্তা মানুষের বুদ্ধি ও যুক্তিকে অস্বীকার করে না। বরং চিন্তা, পর্যবেক্ষণ, গবেষণা ও জ্ঞানার্জনকে উৎসাহিত করে। তবে ইসলামী দৃষ্টিতে মানুষের বুদ্ধি জ্ঞানার্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলেও তা চূড়ান্ত সত্যের একমাত্র উৎস নয়।

অন্যদিকে আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তার বিকাশে Renaissance, Scientific Revolution এবং Enlightenment যুগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তি, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য অনুসন্ধানের যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আধুনিক পৃথিবীকে আমূল পরিবর্তন করেছে, তার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে পাশ্চাত্যের অবদান অনস্বীকার্য।

এখানেই দুই জীবনদর্শনের একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়। ইসলামী সংস্কৃতি জ্ঞানকে সত্য, নৈতিকতা ও স্রষ্টার প্রতি দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখে; অন্যদিকে আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তা জ্ঞানকে প্রধানত যুক্তি, অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করে।

জীবন কি শুধু এই পৃথিবীর জন্য?

ইসলামী জীবনদর্শনে পৃথিবী মানুষের চূড়ান্ত ঠিকানা নয়। পার্থিব জীবন একটি পরীক্ষা, আর আখিরাত তার চূড়ান্ত পরিণতি। তাই একজন মুসলমানের কাছে জীবনের সাফল্য কেবল অর্থ, ক্ষমতা, ভোগ কিংবা সামাজিক মর্যাদার মাধ্যমে পরিমাপিত হয় না; নৈতিক জীবনযাপন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনও তার সাফল্যের অপরিহার্য অংশ।

অন্যদিকে আধুনিক পাশ্চাত্য সমাজে ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা স্বীকৃত হলেও রাষ্ট্র ও সামাজিক দর্শনের ক্ষেত্রে পার্থিব জীবন, ব্যক্তিগত সুখ, স্বাধীনতা, আত্মপ্রতিষ্ঠা এবং বস্তুগত কল্যাণকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে জীবনের সার্থকতা ও মানুষের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য সম্পর্কে দুই জীবনদর্শনের মধ্যে একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

ব্যক্তি, নাকি পরিবার?

মানুষ একই সঙ্গে একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি এবং একটি পরিবারের সদস্য। কিন্তু ব্যক্তিস্বাধীনতা ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে কোনটিকে কীভাবে ভারসাম্যপূর্ণ করা হবে—এই প্রশ্নে মুসলিম ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়।

মুসলিম সংস্কৃতিতে পরিবার কেবল একসঙ্গে বসবাসের একটি ব্যবস্থা নয়; এটি ভালোবাসা, দায়িত্ব, আত্মত্যাগ ও সামাজিক সংহতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা, সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব, আত্মীয়তার বন্ধন এবং প্রবীণদের যত্ন ইসলামী নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অন্যদিকে আধুনিক পাশ্চাত্য সমাজে ব্যক্তিস্বাধীনতা একটি শক্তিশালী মূল্যবোধ। নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার, ব্যক্তিগত পছন্দ, privacy এবং আত্মনির্ভরতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে ব্যক্তির স্বাধীনতা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার সুযোগ অনেক বেড়েছে। তবে একই সঙ্গে কিছু সমাজে পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, একাকীত্ব এবং আন্তঃপ্রজন্মীয় দূরত্ব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

নৈতিকতার ভিত্তি কোথায়?

ইসলামী সংস্কৃতিতে নৈতিকতার ভিত্তি মানুষের খেয়াল-খুশির ঊর্ধ্বে একটি ঐশ্বরিক নির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত। সত্য, ন্যায়, সততা, পবিত্রতা, সংযম ও দায়িত্ববোধকে ধর্মীয় নীতির আলোকে মূল্যায়ন করা হয়। সময় ও সমাজ পরিবর্তিত হলেও কিছু মৌলিক নৈতিক নীতি অপরিবর্তনীয় বলে বিবেচিত হয়।

অন্যদিকে আধুনিক পাশ্চাত্য সমাজে নৈতিকতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানবিক যুক্তি, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইন, মানবাধিকার এবং সামাজিক মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে সময়ের সঙ্গে কিছু সামাজিক ও নৈতিক বিষয়ে আইন ও জনমতের পরিবর্তন ঘটেছে।

অতএব, পার্থক্যটি শুধু কোন কাজটি নৈতিক বা অনৈতিক—সেই প্রশ্নে নয়; বরং নৈতিকতার উৎস কী এবং তা কতটা পরিবর্তনশীল—এই মৌলিক প্রশ্নেও নিহিত।

নারী: অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতা

নারীর অবস্থান নিয়ে মুসলিম ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির তুলনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি। তবে এই বিষয়টি আবেগ দিয়ে নয়, ইতিহাস, সমাজ ও দর্শনের আলোকে বিচার করা প্রয়োজন।

ইসলামী ঐতিহ্যে নারীকে কন্যা, স্ত্রী, মা এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সম্পত্তির অধিকার, উত্তরাধিকার, বিবাহে সম্মতি এবং মোহরের মতো অধিকার ইসলামী বিধানে নারীর জন্য স্বীকৃত। বিশেষত সপ্তম শতকের আরব সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করলে এসব বিধানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

অন্যদিকে আধুনিক পাশ্চাত্য সমাজে নারীর অধিকার মূলত আইনগত সমতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সমান সুযোগের ধারণাকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে। নারীশিক্ষা, ভোটাধিকার, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা প্রতিষ্ঠায় Feminist Movement গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তবে দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে। ইসলামী দর্শন নারী ও পুরুষের মৌলিক মর্যাদা স্বীকার করলেও তাদের ভূমিকা ও দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্যকে অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনা করে। বিপরীতে আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমান অধিকার, সমান সুযোগ ও ব্যক্তিগত পছন্দকে নারী-পুরুষের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখে।

সুতরাং নারী স্বাধীনতা মানেই কেবল পশ্চিমা অনুকরণ নয়; আবার নারীর অধিকার মানেই তাকে কেবল পারিবারিক ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাও নয়। নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা, শিক্ষা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তার স্বীকৃতি—সবকিছুকেই আলোচনার অংশ করতে হবে।

পোশাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতা

পোশাক মানুষের পরিচয় ও মূল্যবোধের একটি দৃশ্যমান প্রকাশ। ইসলামী সংস্কৃতিতে পোশাকের সঙ্গে শালীনতা, সংযম ও নৈতিকতার সম্পর্ক রয়েছে। নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট শালীনতার নীতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অন্যদিকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে পোশাক অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ, স্বাধীনতা ও আত্মপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়। একজন মানুষ কী পরবে এবং কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবে—এটি তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ হিসেবে দেখা হয়।

দুই সংস্কৃতির এই পার্থক্য আসলে পোশাকের চেয়েও গভীর একটি প্রশ্ন সামনে আনে—মানুষের শরীর ও ব্যক্তিসত্তার ওপর ব্যক্তির অধিকার কতটুকু এবং সামাজিক নৈতিকতার সীমা কোথায়?

অর্থনীতি: সম্পদ, নাকি সামাজিক ন্যায়?

ইসলামী অর্থনৈতিক দর্শনে সম্পদ অর্জন নিষিদ্ধ নয়; বরং বৈধ পথে উপার্জনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে সম্পদের সঙ্গে সামাজিক দায়িত্বও যুক্ত। যাকাত, দান, উত্তরাধিকার এবং সম্পদের ন্যায্য ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। সুদ, জুয়া, প্রতারণা ও অন্যায় উপার্জন নিষিদ্ধ করার মধ্যেও একটি নৈতিক অর্থনৈতিক দর্শন কাজ করে।

অন্যদিকে আধুনিক পাশ্চাত্য অর্থনীতিতে পুঁজিবাদ, ব্যক্তিগত মালিকানা, বাজারের স্বাধীনতা ও মুনাফা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিল্পবিপ্লব থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি পর্যন্ত এই ব্যবস্থা উৎপাদন, উদ্ভাবন ও সম্পদ সৃষ্টিতে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে। তবে সম্পদের কেন্দ্রীভবন, আয়বৈষম্য ও অতিরিক্ত ভোগবাদ নিয়ে এর সমালোচনাও রয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: বিরোধ, নাকি সম্ভাবনা?

মুসলিম সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার প্রবণতা ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে গণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, আলোকবিজ্ঞান, রসায়ন ও ভূগোলে অসাধারণ জ্ঞানচর্চা হয়েছে। আল-খাওয়ারিজমির গণিত, ইবন সিনার চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং ইবন আল-হাইথামের আলোকবিজ্ঞানে অবদান বিশ্বজ্ঞানভাণ্ডারে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছে।

ইসলামী দৃষ্টিতে প্রকৃতি স্রষ্টার সৃষ্টি এবং প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা মানুষের জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার যেন মানবকল্যাণের বিরুদ্ধে না যায়, সে বিষয়েও নৈতিকতার গুরুত্ব রয়েছে।

অন্যদিকে আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আধুনিক চিকিৎসা, বিমান, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মহাকাশ গবেষণা মানুষের জীবনযাত্রাকে আমূল পরিবর্তন করেছে।

তবে বিজ্ঞান যত শক্তিশালী হয়েছে, ততই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—মানুষ যা করতে পারে, তা কি সবসময় করা উচিত?

পারমাণবিক অস্ত্র, পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ, জৈবপ্রযুক্তির অপব্যবহার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকি কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিজ্ঞান মানুষকে শক্তি দিতে পারে, কিন্তু সেই শক্তির নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব মানুষেরই।

রাষ্ট্র, আইন ও স্বাধীনতা

ইসলামী রাজনৈতিক দর্শনে ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা, শূরা, জনকল্যাণ এবং নৈতিক শাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কেবল ক্ষমতা প্রয়োগ নয়; বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করাও এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

অন্যদিকে আধুনিক পাশ্চাত্য রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গণতন্ত্র, সংবিধান, আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং জনগণের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক পশ্চিমা দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করা হয়।

তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—মুসলিম বিশ্বে রাষ্ট্র, ধর্ম ও আইনের সম্পর্কের কোনো একক মডেল নেই। বিভিন্ন মুসলিম দেশে রাজনৈতিক ও আইনগত কাঠামো ভিন্নভাবে গড়ে উঠেছে। একইভাবে পশ্চিমা বিশ্বও কোনো একক রাজনৈতিক ব্যবস্থা অনুসরণ করে না।

মুসলিম সংস্কৃতি ও পাশ্চাত্যবাদকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে একটিকে সম্পূর্ণ সত্য এবং অন্যটিকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা বাস্তবতার জটিলতাকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে। দুই সভ্যতারই রয়েছে গৌরবময় অধ্যায়, সীমাবদ্ধতা এবং আত্মসমালোচনার প্রয়োজন।

মুসলিম সংস্কৃতি মানুষকে নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং পরকালীন জবাবদিহিতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অন্যদিকে পাশ্চাত্য সভ্যতা যুক্তিবাদ, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির অসাধারণ সম্ভাবনা সামনে এনেছে।

তাই আজকের বিশ্বের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—মুসলিম সংস্কৃতি জিতবে, নাকি পাশ্চাত্যবাদ? বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—মানুষ কীভাবে তার আত্মিক ও নৈতিক ভিত্তি অক্ষুণ্ণ রেখে জ্ঞান-বিজ্ঞান, মানবাধিকার ও প্রযুক্তির অগ্রগতিকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করবে?

সভ্যতার প্রকৃত সৌন্দর্য হয়তো এখানেই—নিজের শিকড়কে অস্বীকার না করে অন্যের কাছ থেকে শেখা, অন্ধ অনুকরণ না করে ভালোকে গ্রহণ করা এবং উন্নতির সঙ্গে মানবিকতার সম্পর্ক অটুট রাখা।

কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তার অট্টালিকার উচ্চতায়, প্রযুক্তির উৎকর্ষে কিংবা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নির্ধারিত হয় না; বরং একটি সভ্যতা মানুষকে কতটা মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিতে পেরেছে, ন্যায় ও মানবিকতাকে কতটা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে তার মধ্যেই তার প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Our Like Page

Archive Calendar

Verified by MonsterInsights