
কুড়িগ্রামে বন্যার করাল থাবা: পানিবন্দি প্রায় ১৩হাজার মানুষ, ঘর ছেড়ে বাঁধে আশ্রয়, চরম দুর্ভোগে শত শত পরিবার
মোঃ জাফর আহমেদ কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতাঃ
টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুড়িগ্রামের নদ-নদীর পানি বেড়ে জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানির তোড়ে তলিয়ে গেছে অসংখ্য কাঁচা সড়ক। এতে প্রায় ১৩হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় বন্যাকবলিত পরিবারগুলো গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে উঁচু স্থান ও ওয়াপদা বাঁধে আশ্রয় নিচ্ছেন। চারদিকে বিরাজ করছে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর অসহায়ত্বের চিত্র।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল ১০টার তথ্য অনুযায়ী, দুধকুমার নদের পানি কমতে শুরু করলেও এখনো বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি স্থিতিশীল রয়েছে এবং ধরলা ও তিস্তা নদীর পানি ধীরে ধীরে কমছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হঠাৎ করেই পানি বেড়ে যাওয়ায় নদীতীরবর্তী এলাকার শত শত পরিবার চরম দুর্ভোগে পড়েছে। অনেকের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও রান্না করার সুযোগ নেই, কোথাও ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছে। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষ ছুটছেন ওয়াপদা বাঁধ ও উঁচু স্থানের দিকে।
সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নের নামা কাচিচর এলাকার গৃহবধূ শাহিদা বেগম বলেন, “হঠাৎ করেই বন্যার পানি এসে বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। এখনও রান্না করতে পারিনি, ঘরের জিনিসপত্র ওয়াপদা বাঁধে তুলতে ব্যস্ত আছি। ঘরের ভেতরে পানি থাকায় ছোট ছোট বাচ্চারা খাটের ওপর বসে আছে। এখনও তাদের নিরাপদ জায়গায় নিতে পারি নাই।”
মই দিপুর মাঠেরপার এলাকার ফারুক হোসেন বলেন, “এই এলাকায় বেশিরভাগ ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। মহিলাদের রান্নাবান্না করতে চরম অসুবিধা হচ্ছে। গরু-ছাগল স্কুলের মাঠে রাখা হচ্ছে। মানুষ খুব কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।”
একই এলাকার বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, “বাড়ির চারপাশে ও ঘরের ভেতরেও পানি উঠে গেছে। গরু-ছাগল নিয়ে ওয়াপদা বাঁধে আশ্রয় নিতে হচ্ছে। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে খুবই বিপদে আছি। আজকের মধ্যেই সবকিছু নিরাপদ জায়গায় নিতে না পারলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে।”
চর বড়াইবাড়ি ধরলা নদীর পাড়ের বাসিন্দা কৃষক নবীর হোসেন জানান, “অনেক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চর বড়াইবাড়ি ও গড়ের মাতা ইস্টিটা অংশ ভেঙে যায় একই সঙ্গে কয়েকটি ঘরবাড়ি প্রবল স্রোতে নদীতে ভেঙে গেছে। মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করলেও এখন পর্যন্ত প্রশাসনের দৃশ্যমান তৎপরতা তেমন চোখে পড়েনি। দ্রুত ত্রাণ সহায়তা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন দুর্গত মানুষ।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “সকাল থেকে নদনদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী আরও তিন দিন নদীর পানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।”
এদিকে বন্যার পানি বাড়তে থাকায় জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। খাদ্যসংকট, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে পড়েছেন হাজারো মানুষ। দ্রুত কার্যকর সহায়তা না পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।





