
বিষয়: বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অনীহা: করণীয় ও বর্জনীয়
মাওলানা মোহাম্মদ গোলাম মাওলা
মুহাদ্দিস, সৎপুর দারুল হাদিস কামিল মাদ্রাসা, বিশ্বনাথ, সিলেট।
বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তি ও দ্রুত পরিবর্তনের যুগ। শিক্ষা ক্ষেত্রে এসেছে আমূল পরিবর্তন, সহজলভ্য হয়েছে জ্ঞানের বিপুল ভান্ডার। কিন্তু এই প্রযুক্তির প্রাচুর্যের মাঝেও একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে— আমাদের শিক্ষার্থীরা কি পড়াশোনায় কাঙ্ক্ষিত মনোযোগ দিতে পারছে? নাকি নানা বাহ্যিক আকর্ষণে তাদের পড়ার আগ্রহ দিন দিন কমে যাচ্ছে?
সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, পাঠ্যবইয়ের গভীর অনুশীলনের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেমস এবং অতিমাত্রায় স্ক্রিন-নির্ভরতাই শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মুখস্থনির্ভরতা এবং কেবল জিপিএ-৫ পাওয়ার অন্ধ দৌড়, যা অনেক সময় শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য— জ্ঞানার্জন ও নৈতিক বিকাশকে আড়াল করে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষার্থীদের কিছু সুনির্দিষ্ট ‘করণীয়’ এবং ‘বর্জনীয়’ মেনে চলা জরুরি।
শিক্ষার্থীদের জন্য করণীয়:
১. সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও রুটিন: প্রতিদিনের জন্য বাস্তবসম্মত একটি পড়ার রুটিন তৈরি করতে হবে। শুধু পরীক্ষা পাশের জন্য নয়, জানার আগ্রহ থেকে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ”
(সূরা আল-আসর, আয়াত ১-৩)
অর্থাৎ: “সময়ের শপথ! মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, তবে তারা নয় যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে, সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।”
সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানোই সফলতার মূল।
২. গভীর পাঠাভ্যাস (Deep Reading): সংক্ষিপ্ত ডিজিটাল কন্টেন্টের বাইরে গিয়ে মূল পাঠ্যবই ও সৃজনশীল বই মনোযোগ দিয়ে পড়ার অভ্যাস বাড়াতে হবে। বুঝে পড়া এবং নিজ হাতে নোট তৈরি করা অত্যন্ত কার্যকর। কোরআনের প্রথম ওহি ছিল:
“اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ”
(সূরা আল-আলাক, আয়াত ১)
অর্থাৎ: “পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।”রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ”
(ইবনে মাজাহ, হাদিস ২২৪)
অর্থাৎ: “প্রত্যেক মুসলিমের উপর জ্ঞান অর্জন
৩. সময় ব্যবস্থাপনা ও সুস্বাস্থ্য: পড়াশোনার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া জরুরি। প্রতিদিন ৬-৭ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম, সুষম খাবার এবং নিয়মিত খেলাধুলা বা ব্যায়াম মনোযোগ বৃদ্ধিতে সহায়ক। রাসূল ﷺ বলেছেন:
“نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ”
(বুখারি, হাদিস ৬৪১২)
অর্থাৎ: “দুইটি নিয়ামত আছে, অনেক মানুষ এ দুটির মূল্যায়ন করে না— সুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়।”
৪. প্রশ্ন করার মানসিকতা: শ্রেণিকক্ষে শিক্ষককে প্রশ্ন করা এবং সহপাঠীদের সাথে গঠনমূলক আলোচনা ও গ্রুপ স্টাডির মাধ্যমে শেখার গভীরতা বাড়ে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ”
(সূরা আন-নাহল, আয়াত ৪৩)
অর্থাৎ: “তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর।”
শিক্ষার্থীদের জন্য বর্জনীয়:
১. পড়ার সময় ডিজিটাল ডিভাইসের অপব্যবহার: পড়ার টেবিলে মোবাইলের নোটিফিকেশন চালু রাখা বা অযথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় নষ্ট করা অবশ্যই বর্জন করতে হবে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করেছেন:
“وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ”
(সূরা আল-ইসরা, আয়াত ২৬-২৭)
অর্থাৎ: “অপচয় করো না, নিশ্চয় অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।”
২. পড়া জমিয়ে রাখার প্রবণতা: “আজকের পড়া কাল করব”— এই কালক্ষেপণের অভ্যাস পরীক্ষার আগে চরম মানসিক চাপ তৈরি করে। প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিনই শেষ করতে হবে। রাসূল ﷺ বলেছেন:
“اغتنم خمسًا قبل خمسٍ: شبابك قبل هرمك، وصحتك قبل سقمك، وغناك قبل فقرك، وفراغك قبل شغلك، وحياتك قبل موتك”
(হাকিম, হাদিস ৭৮৪৬)
অর্থাৎ: “পাঁচটি জিনিসকে পাঁচটির আগে কাজে লাগাও— যৌবন বার্ধক্যের আগে, স্বাস্থ্য অসুস্থতার আগে, সম্পদ দারিদ্র্যের আগে, অবসর ব্যস্ততার আগে, জীবন মৃত্যুর আগে।”
৩. শুধু নম্বরের জন্য পড়া: শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু সনদ বা জিপিএ অর্জন নয়, বরং অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা। তাই না বুঝে অন্ধভাবে মুখস্থ করার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। কোরআনে আল্লাহ বলেন:
“وَمَا أُوتِيتُم مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا”
(সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৮৫)
অর্থাৎ: “তোমাদেরকে অতি সামান্য জ্ঞানই দেওয়া হয়েছে।”
অতএব নম্বর নয়, বরং জ্ঞানকে কাজে লাগানোই মূল উদ্দেশ্য।
৪. রাত জাগা ও অনিয়মিত জীবন: রাত জেগে সোশ্যাল মিডিয়া বা গেমে আসক্ত থাকার কারণে সকালে ক্লাসে মনোযোগের ঘাটতি তৈরি হয়। এই অভ্যাস বর্জন করা অপরিহার্য। রাসূল ﷺ বলেছেন:
“اللَّهُمَّ بَارِكْ لِأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا”
(তিরমিজি, হাদিস ১২১২)
অর্থাৎ: “হে আল্লাহ! আমার উম্মতের সকালকে বরকতময় করে দিন।”
রাত জাগা নয়, বরং সকালে পড়াশোনা করা অধিক ফলপ্রসূ।
উপসংহার:
শিক্ষা হলো জীবনের ভিত্তিমূল। পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সাথে তাল মেলাতে হলে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের পাশাপাশি পড়াশোনায় আন্তরিক হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতন দিকনির্দেশনা এবং শিক্ষার্থীদের নিজেদের দায়িত্ববোধই পারে একটি আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে। সঠিক করণীয়গুলো গ্রহণ এবং ক্ষতিকর অভ্যাসগুলো বর্জনের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীরা আবার পড়ার টেবিলে পূর্ণ মনোযোগ ফেরাতে পারবে, তখনই আমাদের শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবে ইনশাআল্লাহ।





