
“আন্দোলন থেকে অটোপাস: শিক্ষার ভবিষ্যৎ কোন পথে?”
“শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড”—এই কথাটি আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। কিন্তু আজ প্রশ্ন জাগে, সেই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কি কেবল একটি সনদ অর্জন, নাকি একজন যোগ্য, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা? এই প্রশ্নটি আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশের ইতিহাসে শিক্ষার্থীরা সব সময়ই পরিবর্তনের অগ্রদূত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২৪ এর সরকার পতন আন্দোলন—প্রতিটি অধ্যায়ে তরুণ সমাজের অবদান অনস্বীকার্য। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস, গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়ানো এবং সমাজকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখার শক্তি তরুণদেরই থাকে।
কিন্তু আন্দোলনের একটি পর্যায় আছে, আবার রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনেরও একটি পর্যায় আছে। আন্দোলনের সাফল্যের পর ইতিহাসের প্রতিটি দায়িত্বশীল প্রজন্ম বইয়ের কাছে ফিরে গেছে, কারণ তারা বুঝেছে—একটি সরকার পরিবর্তন করা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, একটি দেশ গড়ে তোলা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সংকটের সময় লাখো তরুণ রাস্তায় নেমেছিল। প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের পর তারা আবার বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মজীবনে ফিরে যায়। নেপালেও দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনকে অগ্রাধিকার দেয়। বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক দেশেই ছাত্র আন্দোলন হয়েছে, কিন্তু আন্দোলন কখনোই স্থায়ী জীবনধারা হয়ে ওঠেনি। কারণ তারা উপলব্ধি করেছে, রাজপথ রাষ্ট্র পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু গবেষণাগার, শ্রেণিকক্ষ ও পাঠাগারই রাষ্ট্রকে সমৃদ্ধ করে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে নানা দাবি-দাওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে অটোপাসের প্রত্যাশা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বা অসন্তোষ প্রকাশ করা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিটি সমস্যার সমাধান যদি পরীক্ষা বাতিল বা অটোপাসে খোঁজা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সেই শিক্ষার্থীই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ চাকরির বাজার, উচ্চশিক্ষা কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা কোনো অটোপাসকে মূল্যায়ন করে না; মূল্যায়ন করে দক্ষতা, জ্ঞান ও সক্ষমতাকে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় অটোপাস ছিল একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। তখন পুরো পৃথিবী অচল ছিল। বিদ্যালয়-কলেজ দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। সেই সিদ্ধান্তকে একটি স্থায়ী অধিকার বা প্রত্যাশায় রূপ দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। ব্যতিক্রমকে যদি নিয়মে পরিণত করা হয়, তাহলে শিক্ষা তার মৌলিক উদ্দেশ্য হারাবে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনায় শিক্ষকদের প্রতি অশোভন আচরণ, অশালীন ভাষা ব্যবহার কিংবা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার খবর সামনে এসেছে। এসব ঘটনা কখনোই পুরো শিক্ষার্থী সমাজের পরিচয় বহন করে না, তবে এগুলো সমাজের জন্য সতর্কবার্তা। শিক্ষককে অসম্মান করে কোনো জাতি কখনো জ্ঞানসমৃদ্ধ হতে পারেনি। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক যদি মুখোমুখি সংঘাতে পরিণত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা।
আজকের প্রজন্মকে প্রায়ই “জেন জি” নামে অভিহিত করা হয়। এই প্রজন্ম প্রযুক্তিতে দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী, উদ্ভাবনী এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, ভাইরাল হওয়ার সংস্কৃতি এবং তাৎক্ষণিক ফল পাওয়ার মানসিকতা অনেকের মধ্যে ধৈর্য কমিয়ে দিয়েছে। অবশ্যই সব তরুণ এমন নন। অসংখ্য শিক্ষার্থী নিরলস পরিশ্রম করছে, গবেষণা করছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করছে। তাই কয়েকটি ঘটনার ভিত্তিতে পুরো প্রজন্মকে বিচার করা অন্যায় হবে। তবে যে প্রবণতাগুলো উদ্বেগ তৈরি করছে, সেগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা জরুরি।
অটোপাসের সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে তিনটি বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
প্রথমত, এটি মেধার মূল্য কমিয়ে দেয়। যে শিক্ষার্থী কঠোর পরিশ্রম করে ভালো ফল করবে এবং যে কোনো মূল্যায়ন ছাড়াই একই সনদ পাবে—তাদের মধ্যে ন্যায্যতার প্রশ্ন তৈরি হবে।
দ্বিতীয়ত, এটি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পথে বাধা সৃষ্টি করবে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যাংকার, শিক্ষক, বিচারক বা প্রশাসক—যে পেশাই হোক, প্রকৃত জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশ্ব এখন দক্ষতার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানে শর্টকাট সংস্কৃতি একটি দেশের ভবিষ্যৎকে দুর্বল করে দিতে পারে।
রাষ্ট্রেরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরীক্ষা পদ্ধতিকে আরও বিজ্ঞানভিত্তিক, স্বচ্ছ ও শিক্ষার্থীবান্ধব করতে হবে। নীতিনির্ধারকদের উচিত দ্রুত সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা, যাতে কোনো পরিস্থিতিই অযথা সংঘাতে রূপ না নেয়। একই সঙ্গে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী কিংবা প্রশাসন—কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
পরিবারকেও সন্তানদের শেখাতে হবে যে অধিকার ও দায়িত্ব একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। প্রতিবাদ করতে হবে, কিন্তু শালীনভাবে; দাবি জানাতে হবে, কিন্তু যুক্তি দিয়ে; মত প্রকাশ করতে হবে, কিন্তু অন্যের মর্যাদা রক্ষা করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা মানে যা খুশি তাই করার অধিকার নয়; স্বাধীনতা মানে দায়িত্বশীলভাবে নিজের অধিকার প্রয়োগ করা।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো জাতি আন্দোলন দিয়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকে না; টিকে থাকে শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং কর্মসংস্কৃতির মাধ্যমে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়া উন্নত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলে; শুধু রাজপথে স্লোগান দিয়ে নয়।
আজকের তরুণদের উদ্দেশে একটি কথাই বলতে চাই—দেশের প্রয়োজনে রাজপথে দাঁড়ান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, গণতন্ত্র রক্ষায় ভূমিকা রাখুন। কিন্তু আন্দোলন শেষে আবার বইয়ের কাছে ফিরুন। কারণ আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে আপনার হাত, আর সেই হাতকে শক্তিশালী করবে শিক্ষা।
দেশের প্রয়োজন প্রতিবাদী তরুণ, কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন জ্ঞানী, দক্ষ, মানবিক ও দায়িত্বশীল তরুণ।
রাজপথ ইতিহাস তৈরি করতে পারে, কিন্তু শ্রেণিকক্ষই ভবিষ্যৎ তৈরি করে।
পিরোজপুর





