
যশোরের অভয়নগরে পল্লী মঙ্গল কলেজে শিক্ষক নিয়োগে অর্থ বাণিজ্য ও জমি আত্মসাৎএর অভিযোগ।
মোঃযায়েদ আলী জাহিদ
যশোর জেলা প্রতিনিধি।
যশোরের অভয়নগর
উপজেলার শুভরাড়া ইউনিয়নের ইছামতী এলাকায় অবস্থিত ‘পল্লী মঙ্গল আদর্শ মহাবিদ্যালয়ে’ ৫ জন শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ এবং জমি দখলের এক চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। সাবেক আওয়ামী লীগ নেতার দাপট আর কলেজের অধ্যক্ষের যোগসাজশে একই পরিবারের তিন সদস্যকে নিয়োগ দেওয়ার বিনিময়ে নগদ টাকা ছাড়াও কলেজের নামে নেওয়ার কথা বলে ২০ শতাংশ জমি সাবেক সভাপতির নিজ নামে রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া অনিয়ম ঢাকতে সাংবাদিকদের সঙ্গে অদ্ভুত আচরণ এবং ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি রাজনৈতিক খোলস বদলের অভিযোগ উঠেছে অভিযুক্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ ও প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সাবেক সংসদ সদস্য রণজিত রায়ের ঘনিষ্ঠ এবং তৎকালীন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক খান শিক্ষার ন্যূনতম যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে কলেজের সভাপতির পদ বাগিয়ে নেন। এরপরই অধ্যক্ষ খায়রুল বাশারকে সাথে নিয়ে শুরু করেন বেপরোয়া নিয়োগ বাণিজ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, একই পরিবারের তিন সদস্য—ছালাম শিকদারের ছেলে রাকিব শিকদার, কালাম শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার এবং হাফিজ শিকদারের ছেলে আকাশ শিকদারকে শিক্ষক পদে নিয়োগ দিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ দাবি করা হয়। তবে প্রার্থীরা এককালীন পুরো অর্থ পরিশোধে অসচ্ছল হওয়ায় কৌশল বদলায় এই সিন্ডিকেট। শর্ত দেওয়া হয়—নগদ ১৫ লাখ টাকা এবং কলেজের নামে ২০ শতাংশ জমি লিখে দিতে হবে।
শর্ত মেনে তারা বর্তমানে চাকরি করলেও অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে অন্য তথ্য। অভিযোগ উঠেছে, কলেজের নামে জমি নেওয়ার কথা থাকলেও চতুরতার সাথে ফারুক খান ও অধ্যক্ষ খায়রুল বাশার মিলে সেই ২০ শতাংশ জমি কলেজের নামে না দিয়ে ফারুক খানের নিজ নামে রেজিস্ট্রি করিয়ে নেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে স্থানীয় বাসিন্দা কামাল ফকির বলেন,
“ফারুক খানের ভাগ্নেদের একই পরিবার থেকে ক্ষমতার বলে চাকরি দেওয়া হয়েছে—এ কথা পুরো এলাকার মানুষ জানে। চাকরির বিনিময়ে ২০ শতাংশ জমি লিখে নেওয়ার কথাটি শতভাগ সত্যি। তখন তাদের যে দাপট ছিল, তাতে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ করার কোনো সুযোগ ছিল না।”
এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কলেজের অধ্যক্ষ খায়রুল বাশারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত অপেশাদার আচরণ করেন। তিনি জানান, কলেজের কোনো বিষয়ে কথা বলতে হলে আগে এনআইডি (NID) কার্ডের ছবি পাঠাতে হবে। তা যাচাই-বাছাই করে সঠিক মনে হলে তবেই তিনি কথা বলবেন। একই সাথে তিনি শর্ত দেন, কথা বলতে হলে শুধু কলেজ চলাকালীন ফোন দিতে হবে এবং রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলতে হলে বিকেলে দিতে হবে।
পরবর্তীতে কলেজ চলাকালীন দুপুর ২টা ২০ মিনিটে পুনরায় ফোন করা হলে তিনি “নামাজ শেষ করে ফোন দিচ্ছি” বলে কল কেটে দেন। কিন্তু পরবর্তীতে কল ব্যাক না করে উল্টো কলেজের এক প্রভাষক এবং স্থানীয় বিএনপি নেতাকে দিয়ে সংবাদ প্রতিনিধির কাছে ফোন করান। সেই সঙ্গে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করেন .
অধ্যক্ষের এমন মনগড়া নিয়ম সম্পর্কে অভয়নগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জনাব শহিদুল ইসলামের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“সাংবাদিক কিংবা যেকোনো সচেতন নাগরিক যদি কোনো অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন করেন, তবে প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে তার বক্তব্য দেওয়া উচিত। জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিয়ে কথা বলার মতো কোনো সরকারি বা প্রশাসনিক বিধিমালা নেই।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অধ্যক্ষ খায়রুল বাশার সবসময় ক্ষমতাসীনদের ছায়াতলে থেকে সুবিধা আদায় করেছেন। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা ও দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করা এমনকি ২০২৪ সালের আওয়ামী নির্বাচনে তিনি তার ইউনিয়নে নৌকার প্রচারনার মুখ্য সমন্নয়ক ছিলেন বলে অভিযোগ আছে, এই সংক্রান্ত একটা ছবি আমাদের হাতে আছে। কিন্তু তারপরেও খায়রুল বাশার ৫ই আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিচয় বদলে অভয়নগর থানা বিএনপির সহ-সভাপতি পদ বাগিয়ে নেন। থানা বিএনপির সহ-সভাপতি হওয়ার পর অভয়নগর ইউনাইটেড কলেজে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি নিজেই স্বীকার করেন, “জীবনে প্রথমবার রাজনৈতিক বক্তব্য দিলাম।”অভিযোগ আছে ৯ লাখ টাকার বিনিময়ে তিনি এই পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির পদে থেকেও তিনি এখনও গোপনে আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং কলেজের প্রতিটি প্রোগ্রামে তাদের আমন্ত্রণ জানান।
রাজনীতি ও পদের পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে অভয়নগর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জনাব ডাবলু কাজী বলেন,
“খায়রুল বাশার অতীতে আওয়ামী লীগের লোকজনের সাথে ঘোরাফেরা করেছেন—এটি সত্য। ৫ই আগস্টের পর তিনি রাজনীতি করার আগ্রহ দেখালে কেবল ‘কলেজ প্রিন্সিপাল’ মর্যাদার কথা বিবেচনা করে তাকে থানা বিএনপির সহ-সভাপতি করা হয়েছে। তবে তিনি দলের কোনো মিছিল-মিটিং বা আন্দোলনে কখনো ছিলেন না।”
কলেজের নামে নেওয়ার কথা বলে ২০ শতাংশ জমি সাবেক সভাপতির নামে রেজিস্ট্রি করার বিষয়ে ডাবলু কাজী আরও বলেন,
“আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছি। খুব দ্রুতই ফারুক খানের কাছ থেকে ওই জমি উদ্ধার করে কলেজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনাব খায়রুল বাশারের খুব কাছের এক ব্যক্তি ও জমির বিষয়ে ঘটনাটি সত্য বলে স্বীকার করেন। তার একটি রেকরডিং আমাদের হাতে হাছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পুঁজি করে কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য, জমি আত্মসাৎ এবং প্রশাসনিক পদের আড়ালে রাজনৈতিক চতুরতার এ ঘটনায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শুভরাড়া ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ। তারা দ্রুত তদন্তপূর্বক অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।





