
সুন্দরবনের উন্নয়ন, বাঘ সংরক্ষণ ও পর্যটনে জোর: প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের পাশে থাকার বার্তা মন্ত্রীর
মোমিন আলি লস্কর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা:
সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, বাঘ সংরক্ষণ, পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং সরকারি পরিষেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিলেন রাজ্যের মন্ত্রী। এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, সুন্দরবন শুধু একটি বনাঞ্চল নয়, এটি এই অঞ্চলের অর্থনীতি, জীবিকা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই সুন্দরবনের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীকে রক্ষা করার পাশাপাশি এখানকার মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নও অত্যন্ত জরুরি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে দেরিতে পৌঁছনোর জন্য ক্ষমা চেয়ে মঞ্চে উপস্থিত বিধায়ক, বিশিষ্ট সমাজসেবী, প্রশাসনিক আধিকারিক, দপ্তরের কর্মী এবং সাধারণ মানুষকে শুভেচ্ছা জানান তিনি। প্রত্যন্ত এলাকায় প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও যেসব সরকারি আধিকারিক দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন, তাঁদের বিশেষভাবে প্রশংসা করেন। তাঁর কথায়, নিজেদের ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার কথা না ভেবে যাঁরা মানুষের সেবায় প্রত্যন্ত এলাকায় থেকে কাজ করছেন, তাঁরা প্রকৃত সম্মান পাওয়ার যোগ্য।
‘আমি রাজা নই, আপনাদেরই ছেলে’
নিজের বক্তব্যে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, তিনি নিজেকে কখনও রাজা হিসেবে দেখতে চান না। বরং সাধারণ মানুষের একজন হয়ে তাঁদের পাশে থাকতে চান। তাঁর কথায়, “আমি আপনাদেরই ছেলে। এর বাইরে কিছু নই। আমি কোনও রাজা নই, পাঁচ মিনিটের জন্যও রাজা হতে চাই না। মানুষের কাজ করার দায়িত্ব পেয়েছি, সেই দায়িত্ব পালন করাই আমার কর্তব্য।”তিনি আরও বলেন, জনপ্রতিনিধি ও সরকারের প্রধান কাজ হল মানুষের জন্য কাজ করা। সেই কাজের বাইরে অহংকার বা ক্ষমতার প্রদর্শনের কোনও জায়গা থাকা উচিত নয়।সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকার উন্নয়ন এখনও বড় চ্যালেঞ্জ সুন্দরবনের মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বহু বছর ধরেই এই অঞ্চলের মানুষ নানা প্রতিকূলতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। কাদা-মাটির রাস্তা, যাতায়াতের অসুবিধা এবং পর্যাপ্ত পরিষেবার অভাবের মতো সমস্যা এখনও অনেক জায়গায় রয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও এখানকার মানুষ তাঁদের সন্তানদের বড় করে তুলছেন এবং ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছেন।
তিনি জানান, শুধু সুন্দরবন নয়, উত্তরবঙ্গ, ডুয়ার্স ও ঝাড়গ্রামের মতো প্রত্যন্ত বনাঞ্চল লাগোয়া এলাকাগুলিতেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। তাই এই অঞ্চলগুলির উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।বাঘ সংরক্ষণই সুন্দরবনের পর্যটন ও অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ এবং পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা। মন্ত্রী বলেন, সুন্দরবনের প্রতি দেশ-বিদেশের মানুষের আকর্ষণের অন্যতম কারণ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। পর্যটকেরা সুন্দরবনে আসেন এই অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীকে কাছ থেকে অনুভব করার আশায়।
তাঁর মতে, বাঘ সংরক্ষণ সফল হলে পর্যটনের সম্ভাবনাও বাড়বে। আর পর্যটন শিল্পের বিকাশ হলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে সুন্দরবনের অর্থনৈতিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হতে পারে।উত্তরবঙ্গের বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি ও বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন। বাঘ সংরক্ষণের জন্য প্রশাসন ও বন দপ্তরের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন।
তবে বাঘ সংরক্ষণের পাশাপাশি বনাঞ্চল লাগোয়া গ্রামের মানুষের নিরাপত্তা ও জীবিকার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে বলে তিনি জানান।
মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান জরুরি
সুন্দরবনে বাঘের আনাগোনা নিয়ে স্থানীয় মানুষের ভয় ও উদ্বেগের বিষয়টিও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। তিনি বলেন, বাঘ বা অন্য বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে এলে আতঙ্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয়টি মাথায় রেখে সতর্কতা ও সচেতনতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বন দপ্তরের কর্মী ও আধিকারিকদের সীমিত কর্মীসংখ্যা নিয়ে অনেক সময় কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ করতে হয়। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষকেও সচেতন হতে হবে এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সহযোগিতা করতে হবে।পর্যটনের বিকাশে বাড়তে পারে কর্মসংস্থান মন্ত্রী মনে করেন, সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পর্যটনের আরও বিকাশ ঘটানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে পর্যটন পরিকাঠামো উন্নত করা গেলে স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে।
তিনি জানান, সুন্দরবন, ঝাড়গ্রাম, উত্তরবঙ্গ ও ডুয়ার্সের মতো বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকার উন্নয়নকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে চলবে না। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষার পাশাপাশি আশপাশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করলেই প্রকৃত অর্থে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব।সরকারি পরিষেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বার্তা
রাজ্য সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে ধাপে ধাপে কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
মহিলাদের জন্য চালু সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। যাঁরা এখনও সুবিধা পাননি, তাঁদের আবেদন করার এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বার্তা দেন। তবে প্রকল্পের সুবিধা ও অর্থপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশিকা অনুসরণ করার উপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বক্তব্যের শেষে তিনি জানান, সুন্দরবনের মানুষের সমস্যা, উন্নয়নের প্রয়োজন এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করা জরুরি। সুন্দরবনকে নিজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানকার মানুষের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার বিষয়টি তাঁর কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে বাঘ ও বনাঞ্চল সংরক্ষণের পাশাপাশি সুন্দরবনের মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং পর্যটনের বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে।অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রশাসনিক আধিকারিক, সমাজসেবী, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন তিনি।





