
ঠাকুর গাঁও জেলার রাজনীতিতে নয় মাসের ব্যবধানে তিনটি আসনের তিন কিংবদন্তির বিদায়ীঃ
স্টাফ রিপোর্টার
রাণীশংকৈল
ঠাকুর গাঁও।
রাজনীতিতে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে— “ব্যক্তির মৃত্যু হলেও আদর্শের মৃত্যু হয় না।” কিন্তু যখন মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে একটি জেলার অভিভাবকতুল্য তিনজন শীর্ষ নেতা একে একে চিরবিদায় নেন, তখন সেই শূন্যতা পূরণ করা সহজ হয় না। ঠাকুরগাঁও জেলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ঠিক তেমনই এক অপূরণীয় ক্ষতি ও শোকের অধ্যায় রচিত হয়েছে।
গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের মে মাসের মধ্যে জেলার তিনটি সংসদীয় আসনের সাবেক তিনজন বর্ষীয়ান সংসদ সদস্যকে হারিয়েছে ঠাকুরগাঁও। তারা হলেন— ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সাবেক এমপি ও সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন, ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সাবেক এমপি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব দবিরুল ইসলাম, এবং ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সাবেক এমপি ইমদাদুল হক।
স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে একের পর এক এই তিন নক্ষত্রের বিদায়ে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয় বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
সময়ের ব্যবধানে এই তিন নেতার মৃত্যুর দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইমদাদুল হক। তার মৃত্যুতে জেলাজুড়ে শোকের আবহ সৃষ্টি হয়।
এর ঠিক ৫ মাস ৮ দিন পর, ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও নির্বাচনী বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন ছাড়াও তিনি দীর্ঘদিন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি পানিসম্পদমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। নদীভাঙন রোধ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং ঠাকুরগাঁও জেলার শিক্ষা, কৃষি, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ খাতে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যুর শোক কাটতে না কাটতেই মাত্র ৩ মাস ২১ দিনের ব্যবধানে জেলায় নেমে আসে আরেকটি বড় ধাক্কা। ২০২৬ সালের ২৮ মে, পবিত্র ঈদের দিনে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ঠাকুরগাঁও-2 আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব দবিরুল ইসলাম।
উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে ৩ বার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও টানা ৭ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিরল রেকর্ড রয়েছে দবিরুল ইসলামের। ১৯৪৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়বাড়ি গ্রামে জন্ম নেওয়া এই নেতা রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর মাধ্যমে। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘদিন ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সংসদীয় বিভিন্ন স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্বও দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গে চা চাষ সম্প্রসারণেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
অন্যদিকে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইমদাদুল হক ছিলেন জেলার একজন জনপ্রিয় ও সংগঠকপ্রতিম আওয়ামী লীগ নেতা। ছাত্রজীবন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি এলাকায় উন্নয়ন ও সংগঠনকে শক্তিশালী করতে নিরলসভাবে কাজ করেন। পরবর্তীতে পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বও সফলতার সঙ্গে পালন করেন।
সব মিলিয়ে মাত্র ৮ মাস ২৮ দিনের ব্যবধানে (প্রায় ৯ মাসে) ঠাকুরগাঁও হারিয়েছে তার তিনজন প্রবীণ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক অভিভাবককে। তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জেলার উন্নয়নে অবদান আজও মানুষের স্মৃতিতে অমলিন।
সংক্ষিপ্ত সময়ের ব্যবধানে জেলার শীর্ষ এই তিন নেতার চিরবিদায়ে ঠাকুরগাঁওয়ের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে গভীর শোকের আবহ বিরাজ করছে। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছেন তাদের অবদান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তিন নেতার বিদায়ে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা অদূর ভবিষ্যতে পূরণ হওয়া কঠিন।
বিজয় ২৪ টিভি
সাহা আলী প্রধান
স্টাফ রিপোর্টার
রাণীশংকৈল
ঠাকুর গাঁও।





