
দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনে কুড়িগ্রামে বড় পদক্ষেপ
শাপলা চত্বর প্রশস্তকরণ শুরু, শহীদ মিনারের পাশ ঘেঁষে হবে বাইপাস সড়ক; যানজটমুক্ত আধুনিক ‘আইকনিক পয়েন্ট’ গড়ার উদ্যোগ, অবৈধ দখল উচ্ছেদের দাবিও জোরালো
মো. জাফর আহমেদ, কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা | ৭ আগস্ট ২০২৬, শুক্রবার
বছরের পর বছর ধরে কুড়িগ্রাম শহরের মানুষের কাছে শাপলা চত্বর ছিল স্থায়ী যানজটের প্রতীক। অফিস-আদালতের ব্যস্ত সময়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটির ঘণ্টা কিংবা দূরপাল্লার বাস শহরে প্রবেশ করলেই এই মোড়ে সৃষ্টি হতো দীর্ঘ যানজট। সংকীর্ণ টার্নিং স্পেস, অপরিকল্পিত মোড়, ভারী যানবাহনের চাপ এবং সড়কের দুই পাশে দখলদারিত্বের কারণে প্রতিদিনই চরম দুর্ভোগে পড়তেন হাজারো মানুষ।
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেই সংকট নিরসনে দৃশ্যমান উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন শাপলা চত্বরের পূর্ব পাশের দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত প্রায় ১৫ ফুট অংশ সড়কের সঙ্গে যুক্ত করে প্রশস্তকরণের কাজ শুরু করেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ ও পৌর প্রশাসন। একই সঙ্গে শহীদ মিনারের পশ্চিম পাশ দিয়ে একটি বিকল্প বাইপাস সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে জেলা শহরের প্রধান প্রবেশমুখে যানজট অনেকটাই কমে আসবে এবং শাপলা চত্বর একটি আধুনিক, দৃষ্টিনন্দন ও কার্যকর ‘আইকনিক পয়েন্ট’-এ পরিণত হবে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, শুধু একটি মোড় প্রশস্ত করলেই কি কুড়িগ্রাম শহরের দীর্ঘদিনের যানজটের স্থায়ী সমাধান হবে? তাদের মতে, শহরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বিশেষ করে বাস কাউন্টার, বাজারসংলগ্ন এলাকা ও ব্যস্ত সংযোগস্থলগুলোও একই পরিকল্পনায় পুনর্বিন্যাস না করলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
গতকাল দুপুরে জেলা শহরের শাপলা চত্বরে প্রশস্তকরণ কাজের উদ্বোধন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদ প্রশাসক আলহাজ সোহেল হোসাইন কায়কোবাদ, প্রেসক্লাব সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সফি খান, সাধারণ সম্পাদক মাহফুজার রহমান টিউটর, শহীদ মিনার স্থাপনকালীন সংগঠক ও সংস্কৃতিকর্মী দুলাল বোস, জ্যোতি আহমেদ, শ্যামল ভৌমিক, সাবেক পৌর মেয়র আবু বক্কর সিদ্দিকসহ বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলা প্রশাসনের সমন্বয় সভায় সর্বসম্মতিক্রমে শাপলা চত্বরের পূর্ব পাশের অতিরিক্ত ও অব্যবহৃত অংশ অপসারণ করে সড়ক প্রশস্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে জায়গা পরিমাপ করে সড়কে যুক্ত করার অংশ চিহ্নিত করা হয়।
জেলা পরিষদ প্রশাসক আলহাজ সোহেল হোসাইন কায়কোবাদ বলেন, “এটি কোনো সৌন্দর্যবিনাশী প্রকল্প নয়, বরং জনদুর্ভোগ কমানোর একটি সময়োপযোগী ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ। শহীদ মিনারের মূল স্থাপনা কিংবা বেদীর কোনো অংশে হাত দেওয়া হচ্ছে না। যারা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছেন, তারা প্রকৃত তথ্য আড়াল করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। উন্নয়ন ও ইতিহাস—দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিয়েই কাজটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, শহীদ মিনার চত্বরের সৌন্দর্যবর্ধনে ফুল ও ছায়াদানকারী গাছ রোপণ করা হবে। পাশাপাশি আধুনিক সোলার আলোকসজ্জার মাধ্যমে পুরো এলাকাকে আরও নান্দনিক করে তোলা হবে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, “শাপলা চত্বরে পর্যাপ্ত টার্নিং স্পেস না থাকায় প্রতিদিন ভারী যানবাহন ও দূরপাল্লার বাস চলাচলে জটিলতা সৃষ্টি হতো। জেলা সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে এটি কুড়িগ্রাম শহরের অন্যতম আইকনিক ও পরিকল্পিত নগরচত্বরে পরিণত হবে।”
অটোচালক, ট্রাকচালক ও দূরপাল্লার বাসচালকরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, শাপলা মোড়ে চিলমারী ও উলিপুরগামী বড় যানবাহন ঘোরাতে দীর্ঘ সময় লাগে। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় প্রায়ই দুই পাশের সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়। তারা বলেন, “শুধু শাপলা মোড় নয়, শহরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় দ্রুত প্রশস্ত করতে হবে। তাহলেই প্রকৃত অর্থে যানজট কমবে।”
একজন দূরপাল্লার বাসচালক বলেন, “বাস কাউন্টারের সামনে বড় বাস ঘোরানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে অনেক দূরে গিয়ে ইউ-টার্ন নিতে হয়। এতে সময় নষ্ট হয়, জ্বালানি ব্যয় বাড়ে, আবার পুরো সড়কও অচল হয়ে যায়।”
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, শাপলা চত্বর প্রশস্তকরণ নিঃসন্দেহে একটি সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। তবে একই সঙ্গে সড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট, স্থাপনা ও দখলদারিত্ব উচ্ছেদ না করলে যানজটের মূল সমস্যা থেকেই যাবে। তাদের ভাষায়, “উন্নয়ন শুধু ইট-পাথরের নির্মাণ নয়; কার্যকর ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের সমন্বয়ই একটি আধুনিক শহরের পরিচয়।”
তাদের দাবি, পৌরসভার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় প্রয়োজনভিত্তিক প্রশস্ত করা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, সুশৃঙ্খল পার্কিং ব্যবস্থা চালু এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় একটি মোড়ের যানজট কমলেও তা অন্য মোড়ে গিয়ে নতুন সংকট সৃষ্টি করবে।
নগর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টদের মতে, শাপলা চত্বর প্রশস্তকরণ কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এটি কুড়িগ্রাম শহরের সামগ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের সূচনা হতে পারে। তবে এই উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পেতে হলে সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, অবৈধ দখলমুক্ত সড়ক, কার্যকর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং ধারাবাহিক প্রশাসনিক তদারকি নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।





