
ফরিদপুর সরকারি শিশু পরিবারে কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা:৬ কর্মকর্তা-কর্মচারী সাময়িক বরখাস্ত
মামুন মিঞা
ফরিদপুর প্রতিনিধি:
ফরিদপুর শহরের টেপাখোলায় সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা)-এ এক কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি দায়িত্বে চরম অবহেলা, উদাসীনতা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রমাণ পেয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কসহ ছয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলামের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে পুরো প্রতিবেদনটি সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে।
সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন— সহকারী পরিচালক ও শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন, তত্ত্বাবধায়ক মো. হাবিবুর রহমান, কম্পিউটার অপারেটর আবীর দাস, মেট্রন-কাম-নার্স মনি আক্তার, আয়া শামসুন্নাহার আক্তার এবং আয়া তানিয়া তাজরীন।
তদন্ত কমিটির এক সদস্যের তথ্য অনুযায়ী, শিশু পরিবারের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা চলছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নিবাসী কিশোরীদের একটি অংশ নিয়মিত অনুমতি ছাড়াই একা বা দলবদ্ধভাবে বাইরে যেত এবং গভীর রাতে ফিরে এলেও কর্তৃপক্ষ তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
এ ছাড়া কিশোরীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত না হলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের একাধিকবার অবহিত করার পরও তত্ত্বাবধায়ক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেননি বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভুক্তভোগী কিশোরী প্রায় ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা হলেও কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বুঝতে বা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা তদন্ত কমিটি সীমাহীন গাফিলতি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভুক্তভোগী কিশোরীটি অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের সন্তান। মায়ের মৃত্যুর পর সৎমায়ের সংসারে বেড়ে ওঠায় তার মধ্যে সহানুভূতি ও ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, যা তাকে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত দরজি ব্যবসায়ীর বিকৃত মানসিকতাকেও ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ৫ জুলাই কিশোরীটির ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরদিন ৬ জুলাই তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার তদন্তে ৭ জুলাই অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুস্মিতা সাহাকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যসচিব ছিলেন সহকারী কমিশনার জান্নাতুল সুলতানা। অন্য সদস্যরা ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. আজমীর হোসেন এবং চিকিৎসা কর্মকর্তা নূপুর পাল।
তদন্ত শেষে কমিটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে— শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে একজন নারী কর্মকর্তাকে নিয়োগ, নিবাসীদের মাসে অন্তত একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা, প্রতিষ্ঠানে আগত দর্শনার্থী ও অন্যান্য ব্যক্তির তথ্য নিয়মিত সংরক্ষণ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা।





