বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:৫৪ অপরাহ্ন [gtranslate]
ব্রেকিং নিউজঃ
গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমানকে প্রত্যাহার শিরোনাম:- ধর্ষক রবিউলের ফাঁসির রায় ও ৩লক্ষ টাকা জরিমানা ঘোষনা নড়াইল জেলা জজ আদালতের। নান্দাইলে সশস্ত্র বাহিনী (অব.) ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের বৃক্ষরোপণ, মাছের পোনা অবমুক্ত ও মানবিক সহায়তা প্রদান নওগাঁর পোরশায় ব্র্যাকের ‘ক্যাটালিস্ট ফর চেইঞ্জ’সিভিল সোসাইটি শীর্ষক প্রকল্প অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত নওগাঁর পোরশায় ব্র্যাকের ‘ক্যাটালিস্ট ফর চেইঞ্জ’সিভিল সোসাইটি শীর্ষক প্রকল্প অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত শিরোনাম-যশোরে নাশকতা ও ভাংচুরের ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক গ্রেপ্তার। বারহাট্টায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ড ভিজিটের শিক্ষার্থীদের সাথে সাংবাদিকদের মত বিনিময় নড়াইলে শিশু জান্নাতুল ধর্ষণ-হত্যা: একমাত্র আসামি রবিউল সিকদার রবির মৃত্যুদণ্ড বোয়ালমারীতে প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ার অভিযোগ, জামায়াত নেতাকে পদ থেকে অব্যাহতি নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভবন ও ড্রেন নির্মাণে বাধা দেয়ায় শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ
বিজ্ঞপ্তিঃ
ব্রেকিং নিউজ*** দেশও বিদেশ খবর পেতে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন।*বিজয় ২৪ টিভি  খবর ও বিজ্ঞাপন প্রচার করতে  যোগাযোগ করুন:gmail :bijoy24tv2024@gmail.com* হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার ০১৭৪৩৮৮৯০৬৮।*সবার পাশে Bijoy 24 TV* আপনারা দেখছেন বিজয় ২৪ টিভি ধন্যবাদ।
কলম থেকে শ্রেণীকক্ষ: নাগরপুরের শিক্ষাজাগরণের অগ্রদূত ছিলেন মরহুম ফজলুল করীম
/ ৬২ Time View
Update : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:১২ পূর্বাহ্ন

কলম থেকে শ্রেণীকক্ষ: নাগরপুরের শিক্ষাজাগরণের অগ্রদূত ছিলেন মরহুম ফজলুল করীম

রামকৃষ্ণ সাহা রামা
টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি

বাংলার প্রত্যন্ত জনপদগুলোর ইতিহাস কেবল নদী, মাটি, কৃষি কিংবা জীবিকার ইতিহাস নয়; এটি মানুষের জেগে ওঠারও ইতিহাস। কোনো কোনো জনপদ একদিন যেখানে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল, সময়ের পরিক্রমায় সেখানেই গড়ে উঠেছে স্কুল, কলেজ, শিক্ষিত প্রজন্ম এবং আলোকিত সমাজ। সেই পরিবর্তনের পেছনে কখনো রাষ্ট্রের ভূমিকা থাকে, কখনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে। আবার কখনো একজন মানুষের স্বপ্ন, ত্যাগ ও নিরলস প্রচেষ্টাই হয়ে ওঠে একটি জনপদের পরিবর্তনের সূচনা। টাঙ্গাইলের নাগরপুরও তেমনই এক জনপদ। আজকের নাগরপুরে স্কুল-কলেজেপড়ুয়া শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও নানা পেশায় প্রতিষ্ঠিত মানুষের সংখ্যা দেখে নতুন প্রজন্মের পক্ষে কল্পনা করা কঠিন—কয়েক দশক আগেও এই অঞ্চলে উচ্চশিক্ষা ছিল অল্পসংখ্যক মানুষের নাগালের মধ্যে। যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, আর্থিক অনটন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা এবং সামাজিক বাস্তবতার কারণে অনেক পরিবারই মাধ্যমিকের পর সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার কথা ভাবতেও পারত না। বিশেষ করে ১৯৪৫ থেকে ১৯৭০—এই সময়টি ছিল নাগরপুরের জন্য পরিবর্তনের এক সন্ধিক্ষণ। দেশভাগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক নানা টানাপোড়েনের মধ্যেও কিছু দূরদর্শী মানুষ উপলব্ধি করেছিলেন—একটি সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব শিক্ষার প্রসার ছাড়া নয়। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, রাস্তা-ঘাট, বাজার কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি একটি জনপদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো শিক্ষিত মানুষ। এই উপলব্ধি থেকেই কেউ কেউ নিজেদের ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য, সম্ভাবনাময় পেশাজীবন ও শহুরে জীবনের আকর্ষণ পেছনে ফেলে ফিরে এসেছিলেন জন্মভূমিতে। তাঁদের লক্ষ্য ছিল একটাই—নিজেদের এলাকার সন্তানদের জন্য শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা। এই আলোকিত মানুষদের অন্যতম ছিলেন মরহুম ফজলুল করীম। শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলাম লেখক, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক, সংগঠক ও শিক্ষানুরাগী—বহুমাত্রিক পরিচয়ে তিনি ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন শুধু একজন মানুষের জীবনকাহিনী নয়; এটি নাগরপুরের শিক্ষাজাগরণ, সামাজিক পরিবর্তন এবং একটি প্রজন্মকে আলোর পথে এগিয়ে নেওয়ার ইতিহাস। ১৯২৯ সালে টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলার গয়হাটা গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মরহুম ফজলুল করীম। পারিবারিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিক শিক্ষার আবহে তাঁর শৈশব গড়ে ওঠে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন কৌতূহলী, অধ্যবসায়ী ও জ্ঞানপিপাসু। গ্রামের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও বইয়ের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আকর্ষণ। পাঠ্যবইয়ের গণ্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ রাখার পরিবর্তে ইতিহাস, সাহিত্য, সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ তাঁর মধ্যে খুব অল্প বয়সেই তৈরি হয়। তৎকালীন গ্রামীণ বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষার পথ ছিল সহজ নয়। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা এবং শহরে গিয়ে পড়াশোনার নানা প্রতিকূলতা অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীকেই মাঝপথে থামিয়ে দিত। কিন্তু ফজলুল করীমের অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তিনি ভর্তি হন করটিয়া সা’দত কলেজে। সেখান থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করার পর তাঁর সামনে খুলে যায় উচ্চশিক্ষার আরও বিস্তৃত দিগন্ত। পরবর্তীকালে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি ছিল সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ভাষা আন্দোলনের চেতনা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। সেখানে অধ্যয়নকালে ফজলুল করীমের চিন্তার জগৎ আরও বিস্তৃত হয়। তিনি পাঠ্যসূচির বাইরে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, রাষ্ট্রচিন্তা, সাংবাদিকতা ও সমাজজীবনের নানা বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতেন। দেশবরেণ্য শিক্ষক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা ও লেখালেখি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এই সময়েই তাঁর সাহিত্যপ্রীতি আরও গভীর হয়। তিনি উপলব্ধি করতে শুরু করেন—কলম শুধু কথা বলে না; কলম মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তুলতে পারে। একটি চিন্তাশীল লেখা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে, সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখাতে পারে এবং পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ফজলুল করীম যোগ দেন তৎকালীন জনপ্রিয় দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় সাব-এডিটর হিসেবে। সেই সময় ঢাকায় জাতীয় দৈনিকে চাকরি করা ছিল একজন তরুণ শিক্ষিত মানুষের জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক ও সম্ভাবনাময় পেশা। রাজধানীর প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ, সাহিত্যিক-সাংবাদিকদের সান্নিধ্য এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগ—সবকিছুই ছিল তাঁর সামনে। কিন্তু ফজলুল করীমের স্বপ্ন ছিল আরও বড়। ঢাকার সম্ভাবনাময় জীবন যখন তাঁকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছিল, তখন তাঁর মন পড়ে থাকত নাগরপুরের মানুষের কাছে। তিনি জানতেন, তাঁর জন্মভূমির অসংখ্য মেধাবী ছেলেমেয়ে শিক্ষার সুযোগের অভাবে পিছিয়ে পড়ছে। তাঁর সামনে তখন যেন দুটি পথ—একদিকে ব্যক্তিগত সাফল্য, অন্যদিকে জন্মভূমির মানুষের জন্য কাজ করার কঠিন দায়িত্ব। তিনি দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেন। তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল সহজ নয়। প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকতার জীবন, শহুরে স্বাচ্ছন্দ্য এবং সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার ছেড়ে গ্রামের অনিশ্চিত বাস্তবতায় ফিরে আসা নিঃসন্দেহে ছিল সাহসের ব্যাপার। কিন্তু ফজলুল করীমের কাছে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার চেয়ে সমাজের ভবিষ্যৎ ছিল বড়। তিনি যেন নিজের জীবনকে একটি প্রশ্নের উত্তর হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন—নিজে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বড়, নাকি নিজের সমাজের কয়েকজন মানুষের জীবন বদলে দেওয়া বড়? এই প্রশ্নের উত্তর তিনি দিয়েছিলেন কর্মের মাধ্যমে। ফজলুল করীম শুধু শিক্ষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন নিবেদিত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। ১৯৫৮ সালে তাঁর ছোটগল্প ‘মসজিদ’, ১৯৬২ সালে ‘কাজল দীঘির পদ্ম’, ১৯৬৫ সালে সাহিত্য সাময়িকী ‘পূর্বাচল’ এবং ১৯৭৮ সালে ‘গীতিকা’ ও ‘আত্মপ্রতিষ্ঠা’ প্রকাশিত হয়। সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি সমাজ, শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের নানা বিষয় তুলে ধরতেন। দৈনিক ইত্তেহাদসহ বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতো। তাঁর লেখার ভাষা ছিল সহজ, সাবলীল ও চিন্তাশীল। অযথা শব্দের বাহুল্য নয়—মানুষের জীবন, সমাজের বাস্তবতা এবং নৈতিক প্রশ্নই ছিল তাঁর লেখার মূল উপজীব্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য সমাজের দর্পণ। সমাজের অসংগতি, মানুষের সংকট ও সময়ের বাস্তবতা সাহিত্যে প্রতিফলিত হবে—এটাই স্বাভাবিক। আবার সাহিত্য মানুষের চিন্তাকে নতুন দিকও দেখাতে পারে। তাঁর কাছে কলম ছিল পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। তিনি মনে করতেন, মানুষের চিন্তার পরিবর্তন ঘটাতে পারলে সমাজ পরিবর্তনের পথও তৈরি হয়। সাংবাদিকতা তাঁকে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল। সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তাকে আরও পরিণত করে। পরবর্তীকালে গ্রামে ফিরে শিক্ষকতাকে জীবনের প্রধান কর্মক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করলেও তাঁর কলম থেমে যায়নি। শিক্ষা, সমাজ, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে তিনি লিখে গেছেন। একজন মানুষ যখন প্রতিষ্ঠিত জীবনের সম্ভাবনা ছেড়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যান, তখন তাঁর সিদ্ধান্তের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গভীর বিশ্বাস কাজ করে। ফজলুল করীমের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তিনি দেখতে পেয়েছিলেন—গ্রামের অসংখ্য শিশু পড়তে চায়, কিন্তু বিদ্যালয় নেই; বিদ্যালয় থাকলেও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সীমিত; আর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখার মতো পরিবেশও অনেকের ছিল না। অসংখ্য সম্ভাবনা যেন অঙ্কুরেই ঝরে যাচ্ছিল। এই বাস্তবতা তাঁকে নাড়া দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন, ঢাকায় থেকে তিনি হয়তো একজন সফল সাংবাদিক হতে পারবেন; কিন্তু নিজের এলাকায় ফিরে গেলে তিনি হয়তো শত শত শিক্ষার্থীর জীবনের পথ বদলে দিতে পারবেন। তাই তিনি ফিরে এলেন নাগরপুরে। এই প্রত্যাবর্তন ছিল কোনো ব্যর্থতার ফল নয়; ছিল একটি সুস্পষ্ট আদর্শিক সিদ্ধান্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন—শিক্ষিত মানুষ যদি নিজের সমাজের জন্য কাজ না করেন, তবে সমাজের পরিবর্তন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। নাগরপুরে ফিরে ফজলুল করীম শিক্ষকতাকে শুধু জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেননি; তিনি এটিকে জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর কাছে একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই পড়ান না। একজন শিক্ষক মানুষ তৈরি করেন, চরিত্র তৈরি করেন এবং সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। এই দর্শন থেকেই তাঁর শিক্ষার আদর্শ গড়ে ওঠে। তিনি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ভালো ফল করার পাশাপাশি সত্যবাদিতা, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিতেন। তাঁর কাছে শিক্ষা মানে ছিল আলোকিত মানুষ তৈরি করা। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ সহানুভূতি। অনেক শিক্ষার্থীর বই কেনার সামর্থ্য ছিল না, কারও আবার প্রয়োজনীয় পোশাকও ছিল না। তিনি তাঁদের পাশে দাঁড়াতেন, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিতেন এবং অভিভাবকদের বোঝাতেন—দারিদ্র্য সাময়িক, কিন্তু শিক্ষা মানুষের আজীবনের সম্পদ। তিনি শিক্ষার্থীদের বই পড়তে উৎসাহিত করতেন। সাহিত্যচর্চা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও রচনা লেখার মাধ্যমে তাঁদের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করতে চাইতেন। কারণ তিনি জানতেন—শুধু শিক্ষিত মানুষ নয়, একটি সমাজের প্রয়োজন চিন্তাশীল মানুষ। গয়হাটায় ফিরে ফজলুল করীম খুব দ্রুত উপলব্ধি করেন, ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি স্থায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক ও সচেতন ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে তিনি উদ্যোগ নেন একটি উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার। তাঁর প্রচেষ্টা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় গয়হাটা উচ্চবিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেননি; বিদ্যালয়ের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি শিক্ষার্থী এবং প্রতিটি স্বপ্নের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। তাঁর কাছে বিদ্যালয় ছিল একটি প্রতিষ্ঠান নয়—একটি পরিবার। প্রধান শিক্ষক হয়েও তিনি নিজেকে কেবল প্রশাসকের ভূমিকায় আবদ্ধ রাখেননি। তিনি ছিলেন শিক্ষক, অভিভাবক, পরামর্শদাতা এবং প্রয়োজনের সময় শিক্ষার্থীদের কাছে একজন আপনজন। একটি বিদ্যালয় যে একটি গ্রামের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে—ফজলুল করীম এই সত্যটি নিজের কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন। ফজলুল করীম খুব ভালোভাবেই বুঝেছিলেন, একটি উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই শেষ কথা নয়। মাধ্যমিকের পর যদি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ না থাকে, তাহলে অনেকেই আবার ঝরে পড়বে। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি নাগরপুরে কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি নাগরপুর কলেজ সংগঠন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক নির্বাচিত হন। কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য জনমত গঠন, শিক্ষানুরাগীদের একত্রিত করা, সহযোগিতা সংগ্রহ এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর কাছে কলেজ ছিল শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি ছিল একটি জনপদের বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন একটি নাগরপুরের, যেখান থেকে ভবিষ্যতের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক, আইনজীবী, সাংবাদিক ও সমাজনেতা তৈরি হবে। আজ নাগরপুরে উচ্চশিক্ষার যে বিস্তার দেখা যায়, সেই দীর্ঘ পথচলার সূচনালগ্নে যাঁরা কাজ করেছিলেন, ফজলুল করীম তাঁদের অন্যতম। শিক্ষাবিস্তারের এই অভিযাত্রা থেমে থাকেনি। ১৯৭১ সালে ফজলুল করীম নাগরপুর শহীদ শামসুল হক উচ্চবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নতুন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করানো ছিল তাঁর দীর্ঘ শিক্ষাসাধনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি অঞ্চলে যত বেশি মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, তত দ্রুত সেই অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে। তাঁর নেতৃত্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুধু পাঠদানের কেন্দ্র ছিল না; এগুলো হয়ে উঠেছিল সামাজিক সচেতনতা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের কেন্দ্র। ফজলুল করীমের কাজ শুধু বিদ্যালয়ের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর আহ্বান জানাতেন। অভিভাবকদের বোঝাতেন—শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। তখন অনেক পরিবার মনে করত, বেশি পড়াশোনা করে লাভ কী? ছেলে হয়তো বাবার পেশায় যাবে, মেয়ের বিয়ে হয়ে যাবে—তাহলে এত পড়াশোনার প্রয়োজন কী? এই মানসিকতার বিরুদ্ধে তিনি যুক্তি ও উদাহরণ দিয়ে কথা বলতেন। তিনি বোঝাতেন, একজন শিক্ষিত সন্তান শুধু নিজের জীবন বদলায় না; সে একটি পরিবারের চিন্তা বদলায়, একটি সমাজের মানসিকতা বদলায় এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন দরজা খুলে দেয়। তাঁর কথায়, কাজে ও ব্যক্তিত্বে মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছিল। ধীরে ধীরে শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ে, উচ্চশিক্ষা নিয়ে মানুষের আগ্রহও বৃদ্ধি পায়। ফজলুল করীম রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল ক্ষমতা অর্জনের সিঁড়ি নয়; মানুষের সেবা করার একটি মাধ্যম। তিনি বিশ্বাস করতেন, সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য শিক্ষিত সমাজ অপরিহার্য। একই সঙ্গে শিক্ষার প্রসারের জন্যও প্রয়োজন সৎ, দূরদর্শী ও জনকল্যাণমুখী নেতৃত্ব। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি জনগণের সেবা করার আরেকটি পথ বেছে নিতে চেয়েছিলেন। তবে তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেননি। পরবর্তীকালে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়। রাজনৈতিক পরাজয় কিংবা কারাবাস তাঁর আদর্শকে ভেঙে দিতে পারেনি। বরং প্রতিকূল অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও দৃঢ় করে। তিনি বুঝেছিলেন, সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো মানুষের চিন্তার পরিবর্তন, আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর পথগুলোর একটি হলো শিক্ষা। ফজলুল করীমের সমগ্র জীবনকে যদি একটি বাক্যে প্রকাশ করতে হয়, তবে বলা যায়—তিনি ছিলেন মানুষ গড়ার কারিগর। তিনি শুধু পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতেন না। তিনি চাইতেন তাঁর শিক্ষার্থীরা যেন সৎ নাগরিক, দায়িত্বশীল মানুষ এবং সমাজের জন্য কল্যাণকর ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে ওঠে। তাঁর শিক্ষা দর্শনের কেন্দ্রে ছিল একটি সহজ সত্য—জ্ঞান যদি নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে সেই শিক্ষা পূর্ণতা পায় না। তাঁর কাছে একজন শিক্ষিত মানুষ মানে শুধু ডিগ্রিধারী মানুষ নয়; বরং এমন একজন মানুষ, যার মধ্যে সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ রয়েছে। এই দর্শনই তাঁকে সাধারণ শিক্ষক থেকে একজন সমাজসংস্কারকের মর্যাদায় উন্নীত করে। ফজলুল করীমের পরিচয় কোনো একটি পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলাম লেখক, সংগঠক, সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ। তবে তাঁর প্রতিটি পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মানুষ। সাহিত্যের মাধ্যমে তিনি মানুষের চিন্তার জগতে আলো ছড়াতে চেয়েছেন। সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজের অসংগতি তুলে ধরেছেন। শিক্ষকতার মাধ্যমে মানুষ গড়েছেন। সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন। আর রাজনীতির মাধ্যমে বৃহত্তর পরিসরে জনসেবার সুযোগ খুঁজেছেন। এই বহুমাত্রিক কর্মজীবনের মধ্যেও তাঁর মূল দর্শন ছিল এক—একটি উন্নত সমাজ গড়তে হলে মানুষকে শিক্ষিত ও সচেতন করতে হবে। আজ কয়েক দশক পর ফিরে তাকালে ফজলুল করীমের অবদানকে শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মূল্যায়ন করলে তাঁর কাজের ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল শিক্ষার প্রতি মানুষের মানসিকতায় পরিবর্তন আনার তাঁর প্রচেষ্টা। তাঁর ছাত্রদের অনেকেই পরবর্তীকালে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, চিকিৎসক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। একজন শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য তাঁর নিজের পদ বা পরিচয়ে নয়; তাঁর ছাত্রদের জীবন ও কর্মে প্রতিফলিত হয়। সেই বিচারে ফজলুল করীমের সাফল্য তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরও দৃশ্যমান। নাগরপুরের অসংখ্য মানুষের জীবনে তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ছড়িয়ে আছে। মানুষের জীবন একদিন শেষ হয়। কিন্তু কিছু মানুষের কর্ম শেষ হয় না। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা, সাহিত্যচর্চা, সাংবাদিকতা, সামাজিক সংগঠন ও জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখার পর জীবনের শেষ সময়েও ফজলুল করীম শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ধরে রেখেছিলেন। যাঁরা তাঁর সান্নিধ্যে এসেছেন, তাঁদের স্মৃতিতে তিনি ছিলেন বিনয়ী, মার্জিত, সৎ ও আদর্শনিষ্ঠ একজন মানুষ। পদ-পদবি বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের অহংকার তাঁর মধ্যে ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার চরিত্রে, তার কাজে এবং মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতায়। ১৯৮৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে ঢাকার তৎকালীন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নাগরপুর হারায় একজন শিক্ষককে, একজন পথপ্রদর্শককে, একজন সমাজসংস্কারককে এবং একজন আলোকিত মানুষকে। কিন্তু তাঁর কর্মের মৃত্যু হয়নি। নাগরপুরের শিক্ষার ইতিহাসে বহু মানুষের অবদান রয়েছে। কেউ জমি দিয়েছেন, কেউ অর্থ দিয়েছেন, কেউ প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, কেউ শিক্ষকতা করেছেন, কেউ মানুষকে সংগঠিত করেছেন। ফজলুল করীমের বিশেষত্ব ছিল—তিনি এসব ক্ষেত্রের অনেকগুলোতেই নিজের অবদান রেখে গেছেন। গয়হাটা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি শিক্ষার ভিত শক্ত করার চেষ্টা করেছেন। নাগরপুর কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। শহীদ শামসুল হক উচ্চবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও প্রধান শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এর পাশাপাশি সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের চিন্তার জগতে আলো ছড়িয়েছেন এবং সমাজসেবার মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এই বহুমাত্রিক অবদানই তাঁকে নাগরপুরের শিক্ষাজাগরণের অন্যতম অগ্রদূত করে তুলেছে। সময়ের সঙ্গে আমরা প্রায়ই আমাদের পথিকৃৎদের ভুলে যাই। অথচ একটি সমাজ তার অতীতকে ভুলে গেলে ভবিষ্যতের পথও অনেকটা অস্পষ্ট হয়ে যায়। ফজলুল করীমকে স্মরণ করা তাই শুধু একজন মানুষকে স্মরণ করা নয়; একটি আদর্শকে স্মরণ করা। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা বড়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ মানে কেবল একটি ভবন নির্মাণ নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নির্মাণ। শিক্ষকতা শুধু চাকরি নয়; এটি মানুষ গড়ার মহান দায়িত্ব। সাহিত্য শুধু বিনোদন নয়; এটি বিবেক জাগানোর শক্তি। আর একজন শিক্ষিত মানুষের নিজের সমাজের প্রতি একটি বিশেষ দায় রয়েছে। আজকের সময়ে শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে, প্রযুক্তি মানুষের হাতে এসেছে, পৃথিবী অনেক ছোট হয়ে এসেছে। কিন্তু ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাও বেড়েছে। এই সময়ে ফজলুল করীমের জীবন নতুন প্রজন্মের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাখে—নিজের মেধা ও সামর্থ্য কি শুধু নিজের জন্য, নাকি নিজের সমাজের জন্যও? তিনি চাইলে ঢাকায় একজন সফল সাংবাদিক হিসেবেই জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু তিনি ফিরে এসেছিলেন জন্মভূমিতে। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি গ্রামের একজন শিশুর চোখে যদি শিক্ষার স্বপ্ন জাগানো যায়, তবে সেটিই একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হতে পারে। ফজলুল করীমের জীবন ও কর্ম শুধু স্মৃতিচারণের বিষয় হয়ে থাকলে চলবে না। তাঁর লেখা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তাঁর কর্মজীবনের দলিল-দস্তাবেজ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। নাগরপুরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাঁর জীবন ও অবদান নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তাঁর নামে স্মারক বক্তৃতা, প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা কিংবা শিক্ষাবৃত্তি চালু করা যেতে পারে। কারণ একটি সমাজ যখন তার গুণীজনকে সম্মান জানায়, তখন নতুন প্রজন্মও সমাজের জন্য কাজ করতে উৎসাহিত হয়। নাগরপুরের ইতিহাস লিখতে গেলে শিক্ষার ইতিহাসকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আর নাগরপুরের শিক্ষার ইতিহাস লিখতে গেলে মরহুম ফজলুল করীমের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করতেই হবে। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি কলমকে ব্যবহার করেছেন চিন্তার আলো ছড়াতে, শিক্ষকতাকে ব্যবহার করেছেন মানুষ গড়তে, সংগঠনকে ব্যবহার করেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণে এবং রাজনীতিকে দেখেছেন জনসেবার একটি মাধ্যম হিসেবে। আজ নাগরপুরের যে অসংখ্য শিক্ষিত মানুষ দেশ-বিদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন, সেই দীর্ঘ অভিযাত্রার শুরুতে যাঁরা প্রথম প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন, মরহুম ফজলুল করীম তাঁদের অন্যতম উজ্জ্বল নাম। সময়ের সঙ্গে মানুষ হারিয়ে যায়, কিন্তু আদর্শ হারায় না। একটি প্রদীপ নিভে যায়, কিন্তু তার আলো ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য প্রদীপে। ফজলুল করীমও তেমনই এক মানুষ—যিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর প্রজ্বলিত শিক্ষার আলো এখনও নাগরপুরের বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে, শিক্ষার্থীদের স্বপ্নে, মানুষের স্মৃতিতে এবং একটি জনপদের শিক্ষার ইতিহাসে জ্বলজ্বল করছে। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন মানুষের ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নাগরপুরের মাটি তাঁকে জন্ম দিয়েছে, নাগরপুরের মানুষ তাঁকে পেয়েছে শিক্ষক হিসেবে, আর তাঁর কর্ম তাঁকে দিয়েছে ইতিহাসের পাতায় একটি স্থায়ী স্থান। মরহুম ফজলুল করীমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। মহান আল্লাহপাক যেন তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান দান করেন, সেই প্রার্থনা করি। আমীন।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Our Like Page

Archive Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
Verified by MonsterInsights