
গবেষণা নিয়ে যত ভুল ধারণা
লেখক: ইমতিয়াজ উদ্দিন, শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রথমবার যখন গবেষণা করছিলাম তখন কম্পিউটারের মনিটরের সাদা স্ক্রিন দেখে মনে হচ্ছিল মাথার ভেতর থেকে আসা হাজার হাজার চিন্তা আর উপাত্তের স্তূপ কি এই কয়েক পৃষ্ঠায় ধরে রাখা সম্ভব? কিংবা রিসার্চ পেপার জমা দেবার পর যদি পাঠকের পক্ষ থেকে ইতিবাচক মন্তব্য না আসে? এই আশঙ্কার অভিজ্ঞতা প্রতিটি নবীণ গবেষকের জীবনের খুবই সাধারণ গল্প।
গবেষণাপত্র লেখা কেবল তথ্য লিখে দেওয়া শুকনো কোনো সাহিত্যচর্চা নয়। আবার এটি কেবল নিরস ডাটা বিশ্লেষণের খেলাও নয়। এটি আসলে একটা শিল্পের মতোই। এই শিল্পে
সমস্যাকে ও তার সমাধানকে বৈজ্ঞানিক গল্পের আকারে পাঠকের বোধগম্য ভাষায় তুলে ধরতে হয়। কিন্তু এই গবেষণাকে কেন্দ্র করে সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা তৈরি হয়। ভুল ধারণাগুলো গবেষণা জিনিসটাকে নবীণ গবেষকের কাছে কঠিন বিষয়বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে।
গবেষণা মানেই সম্পূর্ণ নতুন কিছু আবিষ্কার
গবেষণা মানেই রাতারাতি অলৌকিক বা অচিন্তনীয় কিছু আবিষ্কার করা এমনটা ভাবা আমাদের সমাজে জেঁকে বসা ভুল ধারণাগুলোর মধ্যে একটা। অথচ ‘রিসার্চ’ (Re-search) শব্দটির ভেতরেই মূল অর্থ লুকিয়ে আছে। রিসার্চ শব্দের অর্থ পুনরায় অনুসন্ধান করা। ইতিমধ্যে যে জিনিসটা আছে তাকেই নতুনভাবে অনুসন্ধান করা। বিদ্যমান কাজের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা, কোনো প্রতিষ্ঠিত সত্যকে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নতুন করে পুনরায় যাচাই করা কিংবা পরিচিত সমস্যারই নতুন বা ভিন্ন আঙ্গিকে বিশ্লেষণ দাঁড় করানোও বিশ্বমানের গবেষণা।
বিষয় নির্বাচন করলেই গবেষণা প্রস্তুত
“কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা” কিংবা “ক্যান্সার চিকিৎসা” বা “সময়ের গতি” এর মতো একটি বিশাল বিষয় বা টপিক ঠিক করে ফেললেই গবেষণা শুরু করা যায় এটাও একটা প্রচলিত ভুল ধারণা। টপিক আসলে ছবি আঁকার বিশাল ক্যানভাসের মতো। আসল গবেষণা শুরু হয় যখন সেই ক্যানভাস থেকে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক সমস্যা (Research Problem) এবং সেই সমস্যা থেকে স্পষ্ট প্রশ্ন তৈরি করা হয়।
বেশি বেশি পেপার পড়লেই ভালো গবেষক হওয়া যায়
ভালো গবেষক হবার জন্য বেশি বেশি জার্নাল আর্টিকেল পড়ার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু শত শত পৃষ্ঠা পড়ে গেলে কখনোই তা ভালো গবেষক বানায় না। কতগুলো পেপার পড়া হলো তার চেয়ে বেশি জরুরি কীভাবে পেপারগুলো পড়া হলো। একজন সফল গবেষক পেপারের ফলাফলের চেয়ে বেশি মনোযোগ দেন লেখক কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি, কোন বিষয়গুলো অনুমানের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন কিংবা আলোচনার শেষভাগে কোন কোন সীমাবদ্ধতার সমাধান দিয়ে যেতে পারেননি। লেখক যেসকল সীমাবদ্ধতার সমাধান দিতে পারেননি সেখান থেকেই একজন ভালো গবেষক তার গবেষণা শুরু করেন।
হাইপোথিসিস না মিললে গবেষণা ব্যর্থ
গবেষণা করলে যে হাইপোথিসিস মিলতেই হবে এমন কোনো বাধাধরা নিয়ম নেই। হাইপোথিসিস না মিলাটাকে গবেষণার ব্যর্থতা ধরাটাও আরেকটা ভুল ধারণা। কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা চিন্তা যে আসলে কাজ করছে না সেটি ধরা পড়ে হাইপোথিসিস না মিলার মাধ্যমে। এই সীমাবদ্ধতাটাকেসুনির্দিষ্ট যুক্তিতে উপস্থাপন করতে পারাও কিন্তু রিসার্চের বিরাট সফলতা হতে পারে। এটি বিশ্বজুড়ে ভবিষ্যতের গবেষকদের সময়ের অপচয় ও কোটি টাকার সম্পদ বাঁচিয়ে দেয়।
উচ্চতর ডিগ্রি ছাড়া গবেষণা অসম্ভব
গবেষণা নির্জন ল্যাবে বসে থাকা বিজ্ঞানী কিংবা পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের কাজ এমনটা ভাবাও বিরাট ভুল ধারণা। তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ দক্ষতা, অদম্য কৌতূহল, যুক্তিবোধ এবং সঠিক পদ্ধতি জানা থাকলে যেকোনো ব্যক্তি গবেষণায় ভূমিকা রাখতে পারে।
ডাটা পেলেই বিশ্লেষণ শুরু করা যায়
ফার্ম, হাসপাতাল কিংবা পাবলিক রিপোজিটরি থেকে বিশাল ডাটাসেট পেয়ে গেলেই তাড়াহুড়ো করে বিশ্লেষণ শুরু করে দেওয়া বড় ভুল। প্রাপ্ত ডাটা দিয়ে কোন সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি এবং তার যৌক্তিকতা কতটুকু সেটি আগে স্পষ্ট হওয়া বেশি জরুরী।
জটিল টুল ব্যবহার করলেই কাজ মানসম্মত
সমস্যার মধ্যে যদি গলদ থাকে তবে জটিল টুল বসিয়ে দিলেই কাজ মানসম্মত হয়ে যায় না। মূল সমস্যাটা আসলে কতটা যৌক্তিক সেটা বিবেচনা করা বেশি জরুরী। সমস্যা বা প্রশ্নের সঠিক যুক্তি না থাকলে জটিল সফটওয়্যার বা এআই ব্যবহার করলেও কাজের গুণগত মান বাড়ে না।
গবেষণা ল্যাবের ভিতর একাকী কাজ
অনেকেই মনে করেন গবেষক ল্যাবের ভিতরে একা একাই সব জয় করে ফেলেন।কিন্তু পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে আধুনিক গবেষণা গড়ে উঠে। তথ্যপ্রযুক্তি, পরিসংখ্যান, জীববিজ্ঞান কিংবা অর্থনীতি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষের জ্ঞান যুক্ত হলেই জটিল থেকে জটিলতর সমস্যার টেকসই সমাধান বের হয়।
প্রথম ড্রাফটেই আইডিয়া নিখুঁত হতে হবে
শুরুতেই মাথার ভেতর নিখুঁত গবেষণা প্রস্তাব বা মেথোডোলজি তৈরি থাকতে হবে এই মানসিক চাপ অনেককে কাজ শুরু করতে দেয় না। রিসার্চ আইডিয়া তৈরির প্রক্রিয়াটি ধারাবাহিক। প্রথমে যাত্রাটা একটা সাধারণ চিন্তা থেকে শুরু হয়। নিয়মিত লিটারেচার রিভিউ, সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ ও আলোচনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে আইডিয়া নিখুঁত হবে।
কনফারেন্স কেবল পেপার প্রেজেন্টেশনের জায়গা
বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সেমিনার বা কনফারেন্সে উপস্থিত হওয়া কেবল স্লাইড প্রেজেন্টেশন আর সার্টিফিকেট নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সেখানকার প্রশ্নোত্তর পর্ব, উপস্থিত শ্রোতাদের মতামত এবং অন্যান্য গবেষকদের সাথে অনানুষ্ঠানিক আড্ডা থেকেই জন্ম নেয় ভবিষ্যতের অগণিত গবেষণার নতুন সূত্র।





