
চরবাসীর ন্যায্য অধিকার আদায়ে পৃথক মন্ত্রণালয় ও স্থায়ী বাজেটের দাবি, কুড়িগ্রামে সংবাদ সম্মেলন
মোঃ জাফর আহমেদ কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতাঃ
নদীভাঙন, দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি ও দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার দেশের কোটি কোটি চরবাসীর টেকসই উন্নয়ন ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে চর বিষয়ক পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন এবং জাতীয় বাজেটে চরাঞ্চলের জন্য আলাদা ও স্থায়ী বরাদ্দের জোরালো দাবি উঠেছে কুড়িগ্রামে। একই সঙ্গে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নীতিমালা Pপ্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের নেতৃবৃন্দ।
সোমবার দুপুরে কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরে জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদ। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দেশের অন্যতম বৃহৎ চরাঞ্চল অধ্যুষিত জেলা কুড়িগ্রামে প্রায় ৪ শতাধিক চর রয়েছে, যার মধ্যে আড়াই শতাধিক চরে মানুষের বসবাস। এসব এলাকার মানুষ যুগের পর যুগ নদীভাঙন, যোগাযোগ সংকট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে জীবনযাপন করছে। অথচ জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ ও শ্রমশক্তির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উন্নয়নের মূলধারা থেকে তারা এখনো অনেকটাই বিচ্ছিন্ন।
সংগঠনের তথ্যমতে, গত এক দশকে কুড়িগ্রামে প্রায় এক লাখ মানুষ নদীভাঙনের কারণে গৃহহীন হয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে হাজারো বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক অবকাঠামো। প্রতিবছর নতুন করে অসংখ্য পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর তথ্য অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে কুড়িগ্রামে প্রতি বছর অন্তত পাঁচ হাজার পরিবার অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের শিকার হয়। এছাড়া গত পাঁচ বছরে প্রায় দুই হাজার পরিবার স্থায়ীভাবে জেলার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। ফলে চরাঞ্চলে শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও মানবিক সংকটও ক্রমেই গভীরতর হচ্ছে।
অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাচ্ছে বলা হলেও চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। চরবাসীর উন্নয়নকে আর সাধারণ কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। পৃথক মন্ত্রণালয়, আলাদা বাজেট এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে এই জনগোষ্ঠীর সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কার্যকর পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালু করেছে। অথচ বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার পরিবার সর্বস্ব হারালেও তাদের জন্য কোনো স্থায়ী ও সমন্বিত নীতিমালা নেই। ফলে নদীভাঙন নতুন নতুন দরিদ্র জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করছে।”
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল হক রুবেল বলেন, “চরাঞ্চলের উন্নয়নকে আর প্রান্তিক ইস্যু হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা চরাঞ্চলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থেই চরবাসীর জন্য বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।”
সংবাদ সম্মেলন থেকে সাত দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—চর বিষয়ক পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন, জাতীয় বাজেটে চরাঞ্চলের জন্য আলাদা ও স্থায়ী বরাদ্দ, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নীতিমালা প্রণয়ন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানে বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ এবং চরবাসীর টেকসই উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ খাজা শরীফ উদ্দিন রিন্টু, অধ্যক্ষ শাহ আলম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইয়েদ আহমেদ বাবু, নারী ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক নাজমুন নাহার বিউটিসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, চরবাসীর এই দাবিগুলো কোনো অনুগ্রহের আবেদন নয়, বরং রাষ্ট্রের কাছে তাদের সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। চরাঞ্চলের মানুষকে উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে নদীভাঙন, দারিদ্র্য ও বাস্তুচ্যুতির সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।





