
কালজানির করাল গ্রাসে ধলডাঙ্গা: তিন দিনে নদীগর্ভে শতাধিক বসতভিটা, সীমান্তে মানবিক বিপর্যয়
মোঃ জাফর আহমেদ কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতাঃ রবিবার ৭.৬.২৬
‘ঘরটা চোখের সামনে নদীতে চলে গেল। এখন কোথায় যাব, কীভাবে বাঁচব,কিছুই জানি না।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুরি ইউনিয়নের উত্তর ধলডাঙ্গা গ্রামের মোমেনা বেগম। শুধু মোমেনা নন, কালজানি নদীর ভয়াল ভাঙনে সীমান্তঘেঁষা ধলডাঙ্গার শত শত পরিবার আজ একই আর্তনাদে প্রহর গুনছে। নদীর গর্জনে মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর গড়ে তোলা ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও জীবনের সব স্বপ্ন। একদিকে প্রমত্ত কালজানি, অন্যদিকে ভারতীয় সীমান্ত—দুইয়ের মাঝে আটকা পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন।
কালজানি নদীর তীব্র ভাঙনে শিলখুরি ইউনিয়নের উত্তর ধলডাঙ্গা ও দক্ষিণ ধলডাঙ্গা গ্রামে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, গত তিন দিনে দুই গ্রামের অন্তত ১০০টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে উত্তর ধলডাঙ্গায় ৭০টি এবং দক্ষিণ ধলডাঙ্গায় ৩০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী জানান, উত্তর ধলডাঙ্গা এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার এবং দক্ষিণ ধলডাঙ্গায় ১ হাজার ৬০ মিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। নদীর প্রবল স্রোতে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
শিলখুরি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইউসুফ হোসেন বলেন, গত এক বছরে কালজানি নদী বাম তীর থেকে গড়ে প্রায় ১০০ মিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। এতে গত এক বছরে প্রায় এক হাজার পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী উত্তর ধলডাঙ্গা উচ্চবিদ্যালয় ও এলাকার বউবাজারও নদীভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে।
ভাঙনের শিকার উত্তর ধলডাঙ্গা গ্রামের তোজাম্মেল হক, ময়েন উদ্দিন, সাহেজ উদ্দিন ও মনির হোসেন এবং দক্ষিণ ধলডাঙ্গার আব্দুল কুদ্দুস, আব্দুল জলিল, হাফিজুর রহমান ও সুরমান আলী জানান,রাফিজুল ইসলাম, প্রতিদিন নদী তাদের জীবনের নিরাপত্তা কেড়ে নিচ্ছে। ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
ভাঙনকবলিত ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আনসার আলী বলেন, প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন তাঁর বাড়িতে এসে ভিড় করছেন। কেউ সহায়তা চাইছেন, কেউ ভাঙন ঠেকানোর আকুতি জানাচ্ছেন। মানুষের অসহায়ত্ব দেখে তিনিও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
শনিবার বিকেলে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কুদরত-এ-খুদা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জাকির হোসেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বেনজীর রহমান এবং ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
উত্তর ধলডাঙ্গায় গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আহাজারি দেখে জেলা প্রশাসকসহ উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। নারী-পুরুষেরা তাঁদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেন প্রশাসনের কাছে।
আনোয়ারা বেগম ও আকলিমা বেগম বলেন, ‘ভিটেমাটি হারিয়ে কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। এক পাশে নদী, আরেক পাশে ভারতীয় সীমান্ত। আমরা যাব কোথায়? দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ‘যতটুকু ভাঙন হয়েছে, হয়েছে। এখন আর যাতে কালজানি নদী মানুষের বসতভিটা কেড়ে নিতে না পারে, সে জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রোববার থেকে ভাঙন প্রতিরোধে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হবে।’
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ২ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হবে। প্রয়োজনে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘রোববার থেকেই কাজ শুরু হবে। প্রথম ধাপে ২ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে আরও ব্যাগ সরবরাহ করা হবে।’
চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। অথচ অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার কোনো ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন সহায়তা পায় না। তিনি নদীভাঙনকবলিত মানুষের জন্য স্থায়ী ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান।
সীমান্তঘেঁষা ধলডাঙ্গার মানুষ এখন আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। রাত নামলেই বাড়ে উদ্বেগ। নদীর গর্জন শুনলেই ছুটে যান তীরে। কেউ ঘরের আসবাব সরিয়ে রাখছেন, কেউ আগেভাগেই নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন গবাদিপশু।
এখন ধলডাঙ্গার মানুষের একটাই প্রশ্ন,দুই হাজার জিও ব্যাগ কি পারবে কালজানির আগ্রাসন থামাতে? নাকি আরও শত শত পরিবারকে ভিটেমাটি হারিয়ে নতুন করে উদ্বাস্তু হতে হবে? সেই উত্তর খুঁজছে আজ পুরো ধলডাঙ্গা, আর তাকিয়ে আছে সরকারের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের দিকে।





