
হু হু করে বাড়ছে তিস্তার পানি, প্লাবিত হচ্ছে চর-দ্বীপচর
মোঃ জাফর আহমেদ, কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা | ০৮-০৭-২৬
টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুড়িগ্রামে আবারও ভয়ংকর রূপ নিতে শুরু করেছে তিস্তা নদী। ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে নদীর পানি। ইতোমধ্যে তিস্তা তীরবর্তী চর ও দ্বীপচরের নিচু এলাকা প্লাবিত হতে শুরু করেছে। পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটার আঙিনা ও গ্রামীণ সড়ক। দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছেন নদীপাড়ের হাজারো মানুষ।
বুধবার (৮ জুলাই) সকালে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে সকাল ৬টায় পানির উচ্চতা ছিল ২৮ দশমিক ৮২ মিটার। মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে সকাল ৯টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ দশমিক ৯৬ মিটারে। অর্থাৎ মাত্র তিন ঘণ্টায় পানি বেড়েছে ১৪ সেন্টিমিটার। বর্তমানে তিস্তার পানি বিপৎসীমার মাত্র ৩৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সময়ে দুধকুমার নদীর পাটেশ্বরী পয়েন্টে পানি ১ সেন্টিমিটার এবং ধরলা নদীর তালুকসিমুলবাড়ী পয়েন্টে ২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কুড়িগ্রাম সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি ১ সেন্টিমিটার কমেছে এবং ব্রহ্মপুত্রের চিলমারী পয়েন্টে পানির স্তর অপরিবর্তিত রয়েছে।
পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে গত ২৪ ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিপাত। এ সময়ে চিলমারী উপজেলায় ১৫০ মিলিমিটার, পাটেশ্বরী এলাকায় ৫৪ মিলিমিটার এবং কুড়িগ্রাম সদরে ৫২ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উজানে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে জেলার নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তিস্তা তীরবর্তী ঘড়িয়ালডাঙ্গা চরের বাসিন্দা বদিয়ত মিয়া বলেন, “পানি বাড়তে থাকায় নিচু এলাকার ফসলি জমি ও বসতভিটায় পানি ঢুকতে শুরু করেছে। এক রাতে এত দ্রুত পানি বাড়তে আগে দেখিনি। যেভাবে পানি বাড়ছে, তাতে আজ রাতেই অনেক এলাকা তলিয়ে যেতে পারে।”
প্রতিবছরের মতো এবারও বন্যা ও নদীভাঙনের শঙ্কা নিয়ে দিন কাটছে চরাঞ্চলের মানুষের। অনেক পরিবার এখনো আগের দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তার মধ্যেই নতুন করে পানির তোড়ে ফসল, গবাদিপশু ও বসতভিটা রক্ষার চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।
জেলা চর উন্নয়ন কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, “কুড়িগ্রাম ১৬টি নদ-নদীবেষ্টিত জেলা। একদিকে বন্যা, অন্যদিকে নদীভাঙন—এই দুই দুর্যোগে চরাঞ্চলের মানুষ বারবার সর্বস্ব হারাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দ্রুত দাঁড়ানো এবং নদীভাঙন রোধে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।”
সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বেনজির আহমেদ জানান, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ২৮৫ মেট্রিক টন জিআর চাল, ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা এবং ৮০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি অবনতির দিকে গেলে আরও সহায়তা প্রদান করা হবে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, “উজানে ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে জেলার নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিস্তাসহ জেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানি বিপৎসীমা স্পর্শ করতে পারে। তাই চরাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের কোনো ধরনের গুজবে কান না দিয়ে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সার্বক্ষণিক মাঠে কাজ করছে।”
নদীর পানি যেভাবে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে, তাতে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, উজানে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল নতুন করে বন্যার পানিতে প্লাবিত হতে পারে। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয়দেরও সর্বোচ্চ সতর্কতা ও আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।





