
নেত্রকোনার পূর্বধলায় বিটিআরসি নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ: বেনামি বিলিং, তারের জঞ্জাল ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
সাগর আহমেদ জজ
(নেত্রকোণা) প্রতিনিধি: নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবসায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়ভাবে কিছু রিসেলার বা সাব-ডিস্ট্রিবিউটর মূল লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় আড়াল করে, ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে বিল গ্রহণ, অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন থাকা অবস্থায় পপ (POP) পরিচালনা এবং বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝুঁকিপূর্ণভাবে তার টানার মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মূল আইএসপি (ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার)-এর নাম ব্যবহার করে সংযোগ দিলেও তাদের অফিসে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমান সাইনবোর্ড পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিল গ্রহণ করা হচ্ছে ব্যক্তিগত বা বেনামি বিকাশ নম্বরে। এছাড়া মূল প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত ইন্টারনেট প্যাকেজ ও স্থানীয়ভাবে দেওয়া প্যাকেজের মধ্যেও অসঙ্গতি দেখা গেছে।
উপজেলা সদরের জামতলা এলাকায় সংযোগ দেওয়া এক রিসেলার নিজেকে SkyView Online Limited-এর স্থানীয় প্রতিনিধি দাবি করেন। তিনি জানান, ৫০০ টাকায় ১৫ এমবিপিএস গতির সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত প্যাকেজে একই মূল্যে ৩৫ এমবিপিএস গতির উল্লেখ রয়েছে। এ বিষয়ে মূল প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা জানান, পূর্বধলায় তাদের নিজস্ব কোনো শাখা নেই; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কেবল তাদের কাছ থেকে ব্যান্ডউইথ নিয়ে রিসেলার হিসেবে কাজ করছেন।
একই ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে কুমারখালী এলাকার আরেকটি সংযোগ ব্যবসার ক্ষেত্রেও। স্থানীয় প্রতিনিধি নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি দাবি করলেও সংশ্লিষ্ট জোনাল কর্মকর্তার বক্তব্যে লাইসেন্সের নাম ও পপ স্থাপনের সময় নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। পরে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ওই প্রতিনিধি উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া জানান।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, কয়েকজন রিসেলার গত কয়েক বছরে একাধিকবার মূল আইএসপি পরিবর্তন করেছেন। এ অবস্থায় প্রতিবার নতুন আইএসপির অধীনে পপ স্থাপনের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না এবং বিটিআরসির ডেটা ইনফরমেশন সিস্টেমে (DIS) তা আপলোড করা হয়েছে কি না- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিটিআরসির আইএসপি গাইডলাইন অনুযায়ী, রিসেলার নিজস্ব নামে বা ব্যক্তিগত হিসাবে বিল গ্রহণ করতে পারেন না। পাশাপাশি গ্রাহকের কাছে মূল লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দৃশ্যমান রাখতে হয়। এছাড়া বিদ্যুতের খুঁটি ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি নেওয়াও বাধ্যতামূলক। তবে পূর্বধলার বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটিতে যত্রতত্র তার ঝুলিয়ে সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে দুর্ঘটনা ও শর্টসার্কিটের ঝুঁকি বাড়ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, বিটিআরসির ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার তথ্য রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠান নবায়ন সম্পন্ন করেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো নবায়নের নথি দেখানো হয়নি।
প্রযুক্তি সংশ্লিষ্টদের মতে, অনুমোদনহীন বা অনিয়মিতভাবে পরিচালিত পপ থেকে ইন্টারনেট সেবা দেওয়া হলে ব্যবহারকারীদের আইপি ডিটেইল রেকর্ড (IPDR) সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে কোনো সাইবার অপরাধ বা গুজব ছড়ানোর ঘটনায় প্রকৃত ব্যবহারকারী শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তবে অনুসন্ধানে এমনও দেখা গেছে যে, উপজেলার সব ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ নেই। কয়েকটি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের অফিসে মূল প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড, নিয়মিত বিলিং ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়া গেছে। তাদের দাবি, তারা সরকারি বিধি অনুসরণ করে ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। অবৈধ সংযোগ ব্যবসার কারণে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি বৈধ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এ বিষয়ে বিটিআরসির উপ-পরিচালক মো. আব্দুস শাহীদ চৌধুরী বলেন, যথাযথ অনুমোদন ছাড়া বা গাইডলাইনের বাইরে ইন্টারনেট ব্যবসা পরিচালনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পূর্বধলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয়দের দাবি, মূল লাইসেন্সধারীর পরিচয় গোপন রেখে ব্যবসা পরিচালনা, ব্যক্তিগত হিসাবে বিল গ্রহণ, অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন এবং বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝুঁকিপূর্ণভাবে তার টানার মতো অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। ডিজিটাল নিরাপত্তা, গ্রাহকস্বার্থ এবং সরকারের রাজস্ব সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।





