
পীরগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়;উন্নয়ন, অনিয়ম ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন প্রশ্নের
জল কোন মোহনায় নামবে?
সাকিব আহসান
প্রতিনিধি, পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। একদিকে বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মফিজুল হকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে, অন্যদিকে স্থানীয়দের একটি অংশ দাবি করছেন, বিদ্যালয়ের দৃশ্যমান উন্নয়নে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। একই সঙ্গে তারা প্রশ্ন তুলছেন, যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তবে শুধু একজনকে দায়ী করে কেন সংশ্লিষ্ট অন্যদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, “২০০৯ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মফিজুল হকের সময়ে বিদ্যালয়ে একাডেমিক ভবন, নতুন মার্কেট, গেট, মসজিদ, সিসি ক্যামেরা, শিক্ষক কমনরুম সম্প্রসারণ, মাঠ ভরাট এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। এসব উন্নয়ন দৃশ্যমান বাস্তবতা, যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।”
তিনি আরও বলেন, “অভিযোগ রয়েছে, উন্নয়নকাজে নিয়মিত দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। যদি সত্যিই কোনো আর্থিক অনিয়ম ঘটে থাকে, তবে সে সময়কার ম্যানেজিং কমিটি, তদারকির দায়িত্বে থাকা শিক্ষক-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে তদন্তের আওতায় আনা উচিত। শুধু একজনকে দায়ী করলে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে না।”
বিদ্যালয়ের এক অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা চাই নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। যদি কেউ অপরাধ করে থাকেন, তাঁর বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের সবাইকে আইনের মুখোমুখি করা প্রয়োজন।”
অন্যদিকে কয়েকজন বর্তমান শিক্ষার্থী ও অভিভাবক অভিযোগ করেন, বিদ্যালয়ে এখনো বিভিন্ন পরীক্ষার নামে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়। একজন অভিভাবক বলেন, “সরকার নির্ধারিত ফি ছাড়াও বিভিন্ন খাতে টাকা দিতে হয়। অনেক পরিবারের জন্য এটি কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
বিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, “বিদ্যালয়ের অবকাঠামো আগের চেয়ে উন্নত হলেও শিক্ষার মান এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। শুধু ভবন নির্মাণ করলেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন সম্পূর্ণ হয় না।”
স্থানীয় সচেতন নাগরিক আব্দুল করিম বলেন, “বিদ্যালয়ের মার্কেট থেকে প্রতি মাসে যে ভাড়া আদায় হয়, সেই অর্থের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ্যে আনা উচিত। এতে অযথা বিতর্ক কমবে এবং স্বচ্ছতা বাড়বে।”
এ বিষয়ে স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, “যে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিয়ম মেনে আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন।”
এলাকার সচেতন মহলের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিদ্যালয়ের পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনা পরিবর্তিত হলেও অতিরিক্ত ফি আদায়, স্থানীয় পেমেন্ট, মার্কেটের ভাড়া ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার মান নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, সেগুলোরও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
তাদের দাবি, প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগ, রাজনৈতিক প্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের অতীত ও বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়, মার্কেটের আয়-ব্যয় এবং শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ পর্যালোচনা করা হোক। একই সঙ্গে তদন্তে যার বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ মিলবে, তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তির বিষয়টিও স্পষ্ট করা উচিত। এতে বিতর্কের অবসান ঘটবে এবং পীরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।





