
কুড়িগ্রামের ভোগডাঙ্গায় আবারও ভয়াবহ ধরলা নদীর ভাঙন; হুমকিতে শতাধিক পরিবার ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
কুড়িগ্রাম জেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চরবড়াই বাড়ি এলাকায় আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ধরলা নদীর ভাঙন। প্রতিদিনই নদীর তীব্র স্রোতে বিলীন হচ্ছে মানুষের বসতভিটা, ফসলি জমি এবং বহু বছরের কষ্টে গড়ে তোলা স্বপ্ন। একদিকে বন্যার আশঙ্কা, অন্যদিকে নদীভাঙনের নির্মম থাবায় শতাধিক পরিবার চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চরবড়াই বাড়ি এলাকায় নদীভাঙন প্রতিরোধে সরকারি বরাদ্দ থাকলেও সেখানে কাজ বাস্তবায়ন না করে মধ্যকুমোরপুর ও পাটেশ্বরী এলাকায় প্রকল্পের কাজ করা হয়েছে। এতে ধরলা নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে আবারও চরবড়াই বাড়ির দিকে ধাবিত হয়েছে এবং নতুন করে শুরু হয়েছে ভয়াবহ ভাঙন।
এলাকাবাসী জানান, ইতোমধ্যেই আব্দুল আউয়াল চৌকিদার, শমসের আলী, মেহের আলী, সিরাজ (পাগলা), গাজিউর রহমান, কলিমুদ্দি ও হাফিজুর রহমানসহ বহু পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। চলতি বছরেই প্রায় ১০০ বিঘার বেশি আবাদি জমি নদীতে তলিয়ে গেছে। ফলে অনেক পরিবার তাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
নদীভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে চরবড়াই বাড়ি সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বিদ্যালয়টি যেকোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। এতে শতাধিক শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক মো. আমির হোসাইন (আমু) বলেন,
“আজ চরবড়াই বাড়ির মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। প্রতিদিন নদী আমাদের স্বপ্ন, ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি গ্রাস করছে। আমরা মাননীয় জেলা প্রশাসক, জেলা পরিষদ প্রশাসক এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি—অন্তত জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের ব্যবস্থা করুন। পরে স্থায়ীভাবে ব্লক বা পাইলিং নির্মাণ করা হোক। মানুষের শেষ সম্বলটুকু রক্ষা করুন।”
স্থানীয় বাসিন্দা মো. নবির হোসেন (ডিপজল) বলেন,
“প্রতিদিন ঘুম ভাঙে নদীর গর্জনের শব্দে, আর রাতে ঘুমাতে হয় এই দুশ্চিন্তা নিয়ে—সকালে ঘরটা থাকবে তো? আমরা কোনো বিলাসিতা চাই না, শুধু আমাদের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু বাঁচানোর ব্যবস্থা চাই। সরকার ও পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিক।”
আব্দুল আউয়াল চৌকিদারসহ স্থানীয় আরও কয়েকজন জানান, জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ, বালুভর্তি বস্তা অথবা কংক্রিট ব্লক ফেলে নদীভাঙন প্রতিরোধ করা হলে শত শত পরিবার নিরাপদে বসবাস করতে পারবে এবং ঝুঁকিতে থাকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও রক্ষা পাবে।
এদিকে কুড়িগ্রাম জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং চর উন্নয়ন কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন,
“একদিকে বন্যা, অন্যদিকে নদীভাঙন—এই দুই দুর্যোগে চরাঞ্চলের মানুষ চরম মানবিক সংকটে পড়েছে। উন্নত দেশগুলোতে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে মানুষ সর্বস্ব হারানোর পরও অনেক সময় তাদের খোঁজ নেওয়া হয় না। আমরা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে জোর দাবি জানাই, ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের চরবড়াই বাড়ি এলাকার নদীভাঙন রোধে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।”
বর্তমানে চরবড়াই বাড়ির মানুষ প্রতিটি মুহূর্ত পার করছেন চরম উৎকণ্ঠায়। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর দাবি, সময় থাকতে জরুরি ভিত্তিতে নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। অন্যথায় শতাধিক পরিবার গৃহহীন হওয়ার পাশাপাশি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভিডিও চিত্রে —মোঃ জাফর আহমেদ, কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা।





