
রক্তাক্ত ১৮ জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ, মানবসেবার স্বীকৃতি ও পুনর্বাসনের দাবি জুলাই যোদ্ধা আফজল হুসাইন
স্টাফ রিপোর্টার | কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ)
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধা মোঃ আফজল হুসাইন ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কটিয়াদীর রাজপথে সংঘটিত রক্তাক্ত ঘটনার স্মৃতিচারণ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি কোভিড-১৯ মহামারিতে ঝুঁকি নিয়ে পরিচালিত মানবিক সেবাকর্মের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং বিশেষ বিবেচনায় সরকারি চাকরিতে কর্মসংস্থানের দাবি জানিয়েছেন।
আফজল হুসাইন জানান, ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টের ৩০ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের রায়, সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ১৬ জুলাই রংপুরে নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণে আবু সাঈদসহ কয়েকজন নিহত হওয়ার প্রতিবাদ এবং একজন পেশাদার স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে আহতদের পাশে দাঁড়ানোর নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি ১৮ জুলাই কটিয়াদীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেন।
তিনি বলেন, ১৮ জুলাই কটিয়াদী কলেজ রোড থেকে হাজারো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলে রাজিব ভূঁইয়া, রাব্বি, রাহুল খান, সিয়াম হোসেন, বায়জিদ সোহাগ, মোশাররফ হোসেন শিহাব, জিহাদ, ফরহাদ খান, রায়হানুল ইসলাম রানা, শাহরিয়ার হোসেন রিপন, ফাহিম দিদার, রাজিব মন্ডল, নাদিম রহমান, সোয়াদ ভূঁইয়া, নাঈমুল ইসলামসহ অসংখ্য আন্দোলনকারী অংশ নেন।
আফজল হুসাইনের দাবি, মিছিলটি উপজেলা পরিষদের নতুন গেটের কাছে পৌঁছালে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের সদস্য, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় তিনি ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন। আহত অবস্থাতেও তিনি অন্য আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করেন। তার অভিযোগ, হামলাকারীরা তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ধারণ করা ছবি ও ভিডিও মুছে ফেলে।
তিনি আরও বলেন, হামলার পর শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে পুলিশ গুলি ছোড়ে এবং পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে ওঠে। প্রাণ বাঁচাতে অনেক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ পাশের পুকুর, দোকানপাট ও বাসাবাড়িতে আশ্রয় নেন।
আফজল হুসাইনের দাবি, ওইদিন আহত শতাধিক মানুষ চিকিৎসার জন্য কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলেও তারা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পাননি। পরে অনেকেই ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও স্থানীয় ফার্মেসির মাধ্যমে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন। সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় এখনো অনেকের শরীরে আঘাতের চিহ্ন বহন করতে হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় অধ্যক্ষ এ কে এম ফজলুল হক জোয়ারদার, রফিকুল হায়দার টিটু, নাইম ইসলাম, সাইফুল ইসলাম ও মাহাবুবুর রহমান রুবেলসহ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী ঝুঁকি নিয়ে ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহ করেন। হামলার একপর্যায়ে সাংবাদিক, আন্দোলনকারী ও সাধারণ মানুষ উপজেলা পরিষদের পুরাতন গেট সংলগ্ন একটি দোকানে আশ্রয় নেন।
৪ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরে আফজল হুসাইন বলেন, কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচিকে ঘিরে কটিয়াদী কলেজ মাঠে ছাত্র-জনতা জড়ো হওয়ার আগেই বাজারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র অবস্থান নেওয়া হয়। ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারেননি এবং অধিকাংশ দোকানপাট দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল।
৫ আগস্টের স্মৃতিচারণে তিনি জানান, গণভবন ঘেরাও কর্মসূচির দিন তিনি কটিয়াদী মডেল থানার সামনে অবস্থান করেন। পরে সেনাপ্রধানের ভাষণের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের খবর ছড়িয়ে পড়লে কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে ছাত্র-জনতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে বিজয় মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
কোভিড-১৯ মহামারিতে নিজের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে আফজল হুসাইন বলেন, ২০২০ সালের ১ জুলাই উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার আহ্বানে তিনি কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নমুনা সংগ্রহ, বাড়ি বাড়ি স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য পরামর্শ, মানসিক সহায়তা এবং করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিদের গোসল, কাফন ও দাফনের কাজে অংশ নেন। তিনি জানান, প্রায় নয় মাস বিনা পারিশ্রমিকে দায়িত্ব পালনকালে প্রশাসনের কর্মকর্তা, চিকিৎসক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ব্যাংকার, শিক্ষক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষকে সেবা প্রদান করেন। এ মানবিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংগঠন থেকে সম্মাননা ও প্রত্যয়নপত্র লাভ করেন।
তবে তার অভিযোগ, কোভিড-১৯ মহামারির সময় সরকারি দায়িত্ব পালন করলেও পরবর্তীতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ তুলে তাকে চূড়ান্ত নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হয়।
এদিকে গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধা (কেস আইডি: ৩৭৫৬৩) হিসেবে আফজল হুসাইন ১ মার্চ ২০২৬ তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিশেষ বিবেচনায় মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (এমটি ডেন্টাল) পদে সরকারি চাকরির আবেদন করেন। আবেদনের অনুলিপি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়।
আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালের পুনর্বাসন-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন এবং ১৭ জুন ২০২৫ প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেট (অতিরিক্ত সংখ্যা)-এর ২(খ)(৩) ধারার আলোকে তিনি কর্মসংস্থানের যোগ্য দাবিদার। তার দাবি, এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একাধিক আবেদন করা হলেও তার ফাইল এখনো প্রশাসন-১ শাখায় নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
পাশাপাশি তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ও শহীদ পরিবারের অনেক প্রকৃত সদস্য এখনো গেজেটভুক্ত হননি। তিনি সরাসরি তদারকির মাধ্যমে প্রকৃত জুলাই যোদ্ধাদের গেজেটভুক্ত করা, পুনর্বাসন কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সরকারি কর্মসংস্থানের প্রজ্ঞাপন কার্যকর করার জন্য সরকারের সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করেন।





