
নানান সংকটে চলছে জবির ডে-কেয়ার সেন্টার, প্রশাসনের নেই কার্যকর পদক্ষেপ
ইমতিয়াজ, জবি প্রতিনিধি
√ মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিতেই চলছে কার্যক্রম
√ দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাসেও ডে-কেয়ার পরিদর্শনে যাননি উপাচার্য
√ মাত্র তিন কর্মচারীর ওপর ১৬ শিশুর দায়িত্ব
√ জনবল ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার তীব্র সংকট
প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব, চরম জনবল সংকট, নামমাত্র বেতন, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক উদাসীনতায় কোনো রকমে চলছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) একমাত্র ডে-কেয়ার সেন্টার। আটটি ছোট কক্ষ নিয়ে পরিচালিত এই সেবাকেন্দ্রে পর্যাপ্ত জনবল ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে শিশুদের মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডরমিটরি ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত ডে-কেয়ার সেন্টারটি ২০১৮ সালের ৩ মার্চ যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠার আট বছর পার হলেও এখনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, পর্যাপ্ত বাজেট ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এটি নানা সংকটে জর্জরিত। এরই মধ্যে পরিচালনা কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও নতুন কমিটি গঠন করা হয়নি। ফলে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কার্যক্রমেও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে সেন্টারটিতে নিবন্ধিত শিশু রয়েছে ৪০ জন। এর মধ্যে নিয়মিত উপস্থিত থাকে প্রায় ১৬ জন। অথচ তাদের সার্বক্ষণিক দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র তিনজন কর্মচারী। ভর্তি ও মাসিক ফি থেকে আয় হলেও কর্মচারীদের বেতন কাঠামো অত্যন্ত নিম্নমানের।
তথ্য অনুযায়ী, ভর্তি ফি ৩ হাজার টাকা। পরবর্তী মাস থেকে দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য মাসিক ফি ৩ হাজার টাকা এবং দুই বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ তিন কর্মচারীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট মাসিক ব্যয় মাত্র ৩৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে সুপারভাইজারের বেতন ১৭ হাজার এবং দুই সহকারীর বেতন ১০ হাজার টাকা করে।
অভিযোগ রয়েছে, করোনা মহামারির সময় দীর্ঘদিন তাদের বেতন বন্ধ ছিল। ইউজিসির নির্ধারিত বেতন কাঠামোর আওতায় না থাকায় গত চার বছরেও তাদের বেতন বৃদ্ধি হয়নি।
চরম বেতন বৈষম্য, জনবল সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে ডে-কেয়ারের মহিলা সুপারভাইজার শাকিলা জামান সুবর্ণা বলেন, “মাত্র তিনজন কর্মচারী দিয়ে সব শিশুর দেখাশোনা করতে হয়। বর্তমান বেতনে সংসার চালানো খুবই কঠিন। দীর্ঘদিন ধরে বেতন বৃদ্ধি ও জনবল বাড়ানোর দাবি জানানো হলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। খেলনা, শিক্ষাসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামেরও সংকট রয়েছে। অনেক খেলনা নষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় নতুন করে কেনা সম্ভব হচ্ছে না। শিশুদের জন্য আলাদা বিশ্রামাগার, ডাইনিং কর্নার, পর্যাপ্ত এসি, গিজার, কম্পিউটার, প্রিন্টার ও আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করে শিশুদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। ২০২৪ সালে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক সাদেকা হালিম দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও তা স্থায়ী বা কাঠামোগত রূপ পায়নি। এছাড়া পর্যাপ্ত সুবিধার অভাবে ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট থেকে শিশুদের গোসল করানোর ব্যবস্থাও বন্ধ রয়েছে।”
ডে-কেয়ারটিতে শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ও মানসিক বিকাশের ব্যবস্থাও অত্যন্ত সীমিত। নেই কোনো সাধারণ শিক্ষক, গান বা নাচের প্রশিক্ষক। শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলনা ও বিনোদন সামগ্রীও নেই। বিদ্যমান অনেক খেলনাই নষ্ট ও ব্যবহার অনুপযোগী। ফলে শিশুদের সৃজনশীল বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ অভিভাবকদের।
আটটি ছোট কক্ষে পরিচালিত সেন্টারটিতে নেই পৃথক বিশ্রামাগার কিংবা শিশুদের খাবার গ্রহণের জন্য আলাদা ডাইনিং কর্নার। তীব্র গরমে পর্যাপ্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। শীতকালে গরম পানির জন্য গিজারের সুবিধাও নেই। ব্যবহৃত টয়লেটের মান নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটার ও প্রিন্টার নেই। নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা বা আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পার হলেও এখনো ডে-কেয়ার সেন্টারটি পরিদর্শন করেননি। ফলে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
বর্তমানে সেন্টারটির সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে ১৫ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা এবং একজন শিক্ষার্থী রয়েছেন। তবে যথাযথ প্রচারের অভাবে অধিকাংশ শিক্ষক-শিক্ষার্থীই জানেন না যে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ডে-কেয়ার সেন্টার রয়েছে।
সেবাগ্রহীতা এক অভিভাবক বলেন, “আমরা দুজনই চাকরিজীবী। বাসায় সন্তানকে দেখাশোনার মতো কেউ না থাকায় বাধ্য হয়ে তাকে ডে-কেয়ারে রাখতে হচ্ছে। এখানকার পরিবেশ মোটামুটি ভালো। তবে জনবল বৃদ্ধি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার এবং শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলে অভিভাবকরা আরও নিশ্চিন্তে সন্তানকে এখানে রাখতে পারবেন।”
ডে-কেয়ারটি নতুন একাডেমিক ভবনে স্থানান্তরের পরিকল্পনা থাকলেও শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে সেটি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
ডে-কেয়ারের পরিচালক অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগম বলেন, “ডে-কেয়ারের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থাভাব। প্রয়োজনীয় বাজেট না থাকায় জনবল বৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না। কমিটির সদস্যদের কোনো সম্মানী না থাকায় অনেকেই দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হন না। কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন কমিটি গঠনের জন্য উপাচার্যের কাছে আবেদন করা হলেও এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো প্রশাসনকে জানানো হলেও সমাধান হচ্ছে না। পর্যাপ্ত বাজেট পেলে ডে-কেয়ারে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।”
এর আগে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম জনবল, বেতন ও শিশুদের স্বাস্থ্য-নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি, এখনো তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দীনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ এই সেবাকেন্দ্রকে কার্যকর করতে হলে জনবল বৃদ্ধি, কর্মচারীদের বেতন বৈষম্য দূর করতে হবে।
##





