
রাষ্ট্র কি শুধু ইতিহাস নিয়েই বাঁচবে, নাকি ভবিষ্যৎও নির্মাণ করবে?
একটি নাগরিকের দৃষ্টিতে উন্নয়ন, জবাবদিহি ও রাষ্ট্রচিন্তা
একটি জাতি শুধু ইতিহাসকে বুকে নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না; তাকে ভবিষ্যৎও নির্মাণ করতে হয়। ইতিহাস আমাদের পরিচয় দেয়, আত্মপরিচয়ের ভিত্তি গড়ে দেয়, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে শেখায়। কিন্তু কোনো জাতি যদি প্রতিদিন শুধু অতীত নিয়েই ব্যস্ত থাকে, তবে একসময় সে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। ইতিহাস সম্মানের, কিন্তু উন্নয়ন নির্মিত হয় বর্তমানের সঠিক সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যতের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ওপর।
চীনের শেনজেন আজ বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি নগরী। অথচ মাত্র চার দশক আগে এটি ছিল একটি ছোট জেলেপাড়া। দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে আজ প্রযুক্তি, শিক্ষা ও শিল্পে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। সিঙ্গাপুরের উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না; কিন্তু সুশাসন, দক্ষ নেতৃত্ব, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে তারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে—উন্নয়নের জন্য সম্পদের চেয়ে সঠিক নীতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই দেশগুলো ইতিহাস ভুলে যায়নি। কিন্তু তারা ইতিহাসকে ভবিষ্যতের পথে বাধা হতে দেয়নি। তারা অতীতকে স্মরণ করেছে, আর ভবিষ্যৎকে নির্মাণ করেছে।
বাংলাদেশও একদিন এমন স্বপ্ন দেখেছিল। আজও সেই স্বপ্ন বেঁচে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমাদের জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কী? আমরা কি বিজ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, নাকি এখনো রাজনৈতিক বিভাজন, স্লোগান, মিছিল এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছি?
রাষ্ট্রের শক্তি তার বক্তৃতায় নয়; তার প্রতিষ্ঠানে। একটি দেশের প্রকৃত অগ্রগতি বোঝা যায় আদালতের স্বাধীনতায়, প্রশাসনের জবাবদিহিতে, নাগরিক সেবার মানে, শিক্ষার গুণগত উন্নতিতে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
যদি জুলাইয়ের ঘটনায় বহু মানুষ নিহত হয়ে থাকেন এবং আরও অনেকে গুরুতর আহত বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন—যেমন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে—তাহলে নাগরিক হিসেবে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলাই স্বাভাবিক: এই ঘটনার পূর্ণ সত্য উদঘাটনে কী অগ্রগতি হয়েছে? দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত ও বিচারের প্রক্রিয়া কোথায় দাঁড়িয়ে? এমন বড় ঘটনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিকের অধিকার।
একইভাবে, এ ধরনের সংবেদনশীল ঘটনা নিয়ে গবেষণাভিত্তিক কাজেরও গুরুত্ব রয়েছে। একটি ডকুমেন্টারি শুধু কিছু ভিডিওচিত্রের সমষ্টি নয়। এর জন্য প্রয়োজন তথ্য যাচাই, নথিপত্র, বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতা এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ। ইতিহাসের দলিল তৈরির দায়িত্ব হালকাভাবে নেওয়া যায় না।
আরেকটি প্রশ্ন আমাকে দীর্ঘদিন ভাবায়—দেশে এত মিটিং-মিছিলের প্রকৃত অর্জন কী? গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও দেখতে হবে, সেই কর্মসূচি সাধারণ মানুষের জীবন, কর্মঘণ্টা ও অর্থনীতির ওপর কী প্রভাব ফেলছে। যদি একটি কর্মসূচির ফলে মানুষের দুর্ভোগই বেশি বাড়ে, তবে তার কার্যকারিতা নিয়েও আলোচনা হওয়া উচিত। গণতন্ত্রে প্রশ্ন করা যেমন অধিকার, তেমনি প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও দায়িত্ব।
ব্যক্তিগতভাবে আমি বরাবরই দলীয় ছাত্র রাজনীতির সমালোচক। এটি একটি নীতিগত অবস্থান, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। আমার বিশ্বাস, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে। শিক্ষার্থীদের সময়, মেধা ও শক্তি ব্যয় হওয়া উচিত গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, সাহিত্য এবং দক্ষতা অর্জনে। রাজনৈতিক সচেতনতা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ যেন এমন হয়, যেখানে মতের ভিন্নতা সহিংসতার নয়, যুক্তির মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
রাষ্ট্রকে বুঝতে চাইলে সংসদের দিকে তাকানোর পাশাপাশি রাস্তায়ও তাকাতে হয়। সেই রাস্তায় দেখা যায়—একজন রিকশাচালক সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করছেন। তিনি হয়তো দেশের জিডিপি, বৈদেশিক ঋণ বা ব্যাংকিং খাতের জটিল পরিসংখ্যান জানেন না। কিন্তু তিনি জানেন, আজ কাজ না করলে আজ তাঁর পরিবারের খাবার জুটবে না। উন্নয়নের সব পরিকল্পনার কেন্দ্রে এই মানুষটির জীবনমান থাকা উচিত।
আমিও একজন সাধারণ নাগরিক। আমার অভিজ্ঞতাও খুব আলাদা নয়। গত দুই মাস ধরে আমার বাসায় গ্যাসের সংযোগ নেই। তবুও নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে বিদ্যুতের চুলায় রান্না করায় বিদ্যুৎ বিলও বেড়ে গেছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত অসুবিধা নয়; এটি একটি বড় প্রশ্নের প্রতীক—নাগরিক সেবার মান কতটা কার্যকর? একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সফলতা কেবল বড় প্রকল্পে নয়; বরং একজন সাধারণ নাগরিক সময়মতো প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না, সেটিতেও।
নেতৃত্বের বিষয়েও কিছু কথা বলা জরুরি। নেতৃত্ব কেবল একটি পদ নয়; এটি একটি দায়িত্ব। ইতিহাসে যেসব নেতা মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন, তারা সংকটের সময় মানুষের পাশে থেকেছেন। আবার ইতিহাস এটাও দেখিয়েছে, কোনো নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা, সময় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করে। তাই ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করাই একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ।
একজন নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা খুব বড় নয়। আমি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে একজন কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন, একজন শ্রমিক সম্মানজনক মজুরি পাবেন, একজন শিক্ষার্থী নিরাপদ ও গবেষণাবান্ধব পরিবেশে পড়াশোনা করবেন, একজন উদ্যোক্তা হয়রানির শিকার হবেন না, একজন রোগী ন্যায্য চিকিৎসা পাবেন এবং একজন সাধারণ নাগরিক সেবা পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত ভোগান্তিতে পড়বেন না।
পরিবর্তন শুধু সরকার পরিবর্তনের নাম নয়। পরিবর্তন মানে নাগরিকের জীবন সহজ হওয়া। পরিবর্তন মানে দুর্নীতি কমা, সেবার মান বাড়া, বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পাওয়া এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করে তোলা।
শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা কেমন বাংলাদেশ গড়তে চাই?
একটি বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিদিন অতীতের দ্বন্দ্বই আলোচনার বিষয় হবে, নাকি এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে আগামী প্রজন্ম বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা, শিল্প, সাহিত্য ও মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে?
আমার বিশ্বাস, এই দেশের মানুষ বিলাসিতা চায় না। তারা চায় ন্যায্য সেবা, আইনের সমান প্রয়োগ, সুশাসন, জবাবদিহি, কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার স্লোগানে নয়, তার প্রতিষ্ঠানে। একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি তার অতীতের গৌরবে নয়, তার ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্ষমতায়। ইতিহাস আমাদের অনুপ্রেরণা দেবে, কিন্তু আগামী প্রজন্ম আমাদের বিচার করবে—আমরা তাদের জন্য কেমন রাষ্ট্র রেখে গেলাম।
__লেখা: মোঃ মনির হোসেন।
একজন গ্রন্থাগারিক, শিক্ষাবীদ ও সমাজসেবক।





