
নাগরপুরের শিক্ষাজাগরণের অগ্রপথিক মোঃ আবদুর রহমান
রামকৃষ্ণ সাহা রামা
টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি
মানুষ ক্ষণস্থায়ী। পৃথিবীর বুকে মানুষের আগমন ঘটে, আবার একদিন তাকে ফিরে যেতে হয় অনন্তের পথে। কিন্তু মানুষের জীবন শেষ হলেও তার কর্ম, আদর্শ ও কীর্তি থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে, সমাজের স্মৃতিতে। যুগের পর যুগ কোনো কোনো মানুষ তাঁদের জ্ঞান, মেধা, সততা, মানবিকতা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একটি জনপদের ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নেন। টাঙ্গাইলের নাগরপুরের ইতিহাসে তেমনই এক আলোকিত ব্যক্তিত্ব মোঃ আবদুর রহমান। একসময় নাগরপুর ছিল বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। চারদিকে ছিল বন-জঙ্গল, যোগাযোগব্যবস্থা ছিল দুর্গম, আর শিক্ষার আলোও ছিল সীমিত। সেই প্রতিকূল পরিবেশে যে কজন মনীষী নিজেদের মেধা, শ্রম ও আত্মনিবেদনের মাধ্যমে নাগরপুরে শিক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়েছেন, মোঃ আবদুর রহমান তাঁদের অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে মেধাবী ছাত্র, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, রাজনীতিক, সমাজসেবক এবং সমাজ-সচেতন অভিভাবক। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শুধু পাঠদান করেননি; বরং অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনে জ্ঞানের আলো জ্বেলে তাঁদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মোঃ আবদুর রহমান ১৯২৯ সালের ১ মার্চ টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলার ডাঙ্গা শালিনাপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রাম্য পাঠশালায় তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও শাণিত মেধার অধিকারী। তাঁর স্মরণশক্তিও ছিল অসাধারণ। অধ্যবসায়, মেধা ও জ্ঞানপিপাসার কারণে ছাত্রজীবনেই তিনি নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি যদুনাথ পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর ১৯৪৮ সালে করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষায় তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং অর্থনীতিতে বিএ অনার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি এমএ কোর্সে ভর্তি হন। তবে তাঁর জীবনের এই পর্যায়েই ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাঁর শিক্ষাজীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়—১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ভাষার জন্য তাঁর এই ভূমিকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় অনুমতি না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত এমএ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু শিক্ষার প্রতি তাঁর অদম্য আগ্রহ থেমে থাকেনি। শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থাকার সময়ও তিনি উচ্চশিক্ষা অব্যাহত রাখেন। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে বিএড এবং ১৯৬২ সালে এমএড কোর্স সম্পন্ন করেন। অর্থাৎ নিজের শিক্ষাজীবনকে তিনি কেবল একটি ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; শিক্ষক হিসেবে নিজেকে আরও দক্ষ ও যোগ্য করে তোলার জন্য আজীবন জ্ঞানচর্চা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কে টি হোসেন ছিলেন তাঁর ক্লাসমেট। অন্যদিকে, তাঁর হাইস্কুল জীবনের সহপাঠী ছিলেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম খন্দকার আবু তাহের। এই সহপাঠীদের সঙ্গে তাঁর ছাত্রজীবনের সম্পর্ক তাঁর সময়ের মেধাবী প্রজন্মের একটি চিত্রও তুলে ধরে। মোঃ আবদুর রহমানের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় শিক্ষকতা। জ্ঞানকে নিজের মধ্যে আটকে না রেখে তিনি তা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক ও অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনে তিনি করটিয়া সা’দত কলেজে অধ্যাপনা, খাষকাউলিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক, যদুনাথ উচ্চবিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক, সলিমাবাদ এসটি আই হাইস্কুলে সহকারী শিক্ষক, ভাড়রা ইনস্টিটিউশনে সহকারী শিক্ষক, দেলদুয়ার জাঙ্গালিয়া এমআর খান পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক এবং সমবায় উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে তাঁর কর্মজীবনের শ্রেষ্ঠ সময় বা স্বর্ণযুগ বলা যায় নাগরপুরের যদুনাথ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়কে। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১২ বছর তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে বিদ্যালয়টির নেতৃত্ব দেন। তাঁর কাছে শিক্ষকতা ছিল নিছক চাকরি নয়; ছিল মানুষ গড়ার এক মহৎ দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়ার পাশাপাশি তিনি তাঁদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাঁর স্নেহ, শাসন ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন। নাগরপুরে উচ্চশিক্ষার বিস্তারে মোঃ আবদুর রহমানের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯৬৬ সালে নাগরপুর কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কলেজ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে অর্থনীতি ও ইংরেজি বিষয়ে অনারারি শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। একটি অনুন্নত জনপদে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা সেই সময় মোটেই সহজ কাজ ছিল না। প্রয়োজন ছিল উদ্যোগ, সংগঠন, ত্যাগ এবং সমাজের মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি। মোঃ আবদুর রহমান সেই কঠিন কাজটিই করেছিলেন। তাঁর মতো শিক্ষানুরাগী মানুষের প্রচেষ্টা নাগরপুরের শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে আছে। পরবর্তী সময়ে ১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি সমবায় হাইস্কুল, নাগরপুরের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু অবসর তাঁর কাছে কখনোই জ্ঞানচর্চা ও মানুষের প্রতি দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়া ছিল না। একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর ছাত্রদের সাফল্যে। সেই অর্থে মোঃ আবদুর রহমান ছিলেন একজন সফল ও গর্বিত শিক্ষক। তাঁর স্নেহ, আশীর্বাদ, জ্ঞানগর্ভ শিক্ষা ও উপদেশ নিয়ে তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থী পরবর্তী জীবনে দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁর কৃতী শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেজর জেনারেল মাহমুদুল হাসান, প্রিন্সিপাল হুমায়ুন খালিদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী গৌতম চক্রবর্তী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক ডিজি ফরহাদ হোসেন, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সাবেক এডিশনাল সেক্রেটারী আবদুল আহাদ, ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান বাদশা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. শ্যামসুন্দর কর্মকার উল্লেখযোগ্য। তাঁদের সাফল্যের পেছনে মোঃ আবদুর রহমানের মতো শিক্ষকদের অবদান হয়তো পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। কিন্তু তাঁদের জীবনের স্মৃতিতে একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর যে অবস্থান, সেটিই তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন। মোঃ আবদুর রহমান শুধু শিক্ষাঙ্গনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। সমাজ ও মানুষের কল্যাণে রাজনীতিকেও তিনি একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে দেখতেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নাগরপুর থানা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের কল্যাণ, সামাজিক উন্নয়ন এবং এলাকার অগ্রগতি। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেও তিনি শিক্ষকসত্তাকে কখনো বিসর্জন দেননি। পারিবারিক জীবনেও মোঃ আবদুর রহমান ছিলেন একজন দায়িত্বশীল ও সচেতন অভিভাবক। ১৯৫৩ সালে তিনি দেলদুয়ার উপজেলার সৈয়দ পরিবারের কাজী মোখলেসুর রহমানের প্রথম কন্যা নূরুন্নাহার বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় পাঁচ পুত্র ও চার কন্যা। সন্তানদের প্রত্যেককে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর সন্তানরা পরবর্তী জীবনে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সন্তানদের শিক্ষিত, সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল তাঁর পারিবারিক জীবনের অন্যতম বড় সাফল্য। মোঃ আবদুর রহমানের জীবনকে শুধু একজন শিক্ষকের জীবন হিসেবে দেখলে তাঁর অবদানের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন হয় না। তিনি ছিলেন একটি পরিবর্তনশীল সময়ের মানুষ। এমন এক সময়ে তিনি বেড়ে উঠেছেন, যখন নাগরপুর ছিল চরাঞ্চলপ্রধান, যোগাযোগব্যবস্থা ছিল দুর্বল এবং শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। সেই সময় নিজের মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি শিক্ষার বিস্তারে যে ভূমিকা রেখেছেন, তা একটি জনপদের সামাজিক পরিবর্তনের অংশ। তিনি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছেন, শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, রাজনীতির মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে নিজের পরিবারকেও শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছেন। তাঁর জীবন যেন একটি প্রদীপের মতো—নিজে জ্বলেছেন, কিন্তু সেই আলো অন্যের পথকে আলোকিত করেছে। একজন শিক্ষক চলে যান, কিন্তু তাঁর শিক্ষার্থীরা যখন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেন, তখন তাঁর জীবনদর্শনও এক অর্থে বেঁচে থাকে। ২০০৪ সালের ২৩ মে মোঃ আবদুর রহমান পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। তাঁর শারীরিক উপস্থিতির অবসান ঘটলেও তাঁর কর্মময় জীবন নাগরপুরের শিক্ষা ও সামাজিক ইতিহাসে আজও স্মরণীয়। ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবীতে মানুষ সত্যিই আসে, মানুষ চলে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের কর্মের মধ্য দিয়ে সময়কে অতিক্রম করে যান। মোঃ আবদুর রহমান ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। শিক্ষার প্রতি তাঁর অনুরাগ, শিক্ষকতার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা, সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা এবং মানুষের কল্যাণে তাঁর অবদান নাগরপুরের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। নাগরপুরে যখন শিক্ষার আলো ছিল ক্ষীণ, তখন তিনি সেই আলোকে আরও উজ্জ্বল করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা যখন দেশ-বিদেশে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তখন তাঁদের সাফল্যের ভেতর দিয়েই যেন আজও বেঁচে আছেন তাঁদের প্রিয় শিক্ষক মোঃ আবদুর রহমান। মহান আল্লাহ তাঁর বিদেহী আত্মাকে মাগফিরাত দান করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন—এই আমাদের পরম প্রার্থনা।





