
ভোটের প্রচারণায় আড়াল জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ, ঠাকুরগাঁওয়ে ক্ষোভ
মোঃ নুর আলম সিদ্দীক
জেলা প্রতিনিধি, ঠাকুরগাঁও।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের স্মৃতি ধরে রাখতে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ এখন নির্বাচনী প্রচারণার ব্যানার ও বিলবোর্ডে আড়াল। ঠাকুরগাঁও শহরের পুরোনো বাসস্ট্যান্ড মোড়ে অবস্থিত এই স্মৃতিস্তম্ভটি ঘিরে এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক প্রচারণার পাশাপাশি শহীদদের স্মৃতির প্রতিও সম্মান দেখাতে হবে।
নির্বাচনী প্রচারণায় আড়াল স্মৃতিস্তম্ভ
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে শহরজুড়ে চলছে প্রার্থীদের প্রচারণা। প্রতীক বরাদ্দের পর বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেন প্রার্থীরা। এর আগে বুধবার গভীর রাতে বিএনপির সমর্থকেরা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে প্রচারসামগ্রী টাঙাতে শুরু করেন। পুরোনো বাসস্ট্যান্ড গোলচত্বরেও ব্যানার লাগানো হলে স্মৃতিস্তম্ভটির একাংশ ঢেকে যায়। পরদিন বৃহস্পতিবার রাতে জামায়াতের কর্মীরা অবশিষ্ট অংশে ব্যানার ও বিলবোর্ড স্থাপন করেন। এতে স্মৃতিস্তম্ভটি প্রায় পুরোপুরি আড়ালে চলে যায় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
জুলাইয়ের স্মৃতি আড়াল হওয়ায় ক্ষোভ
জুলাই আন্দোলনের স্থানীয় কর্মী আহছানুল হাবিব বলেন, “এই স্তম্ভটি আমাদের সেই আন্দোলনের দিনগুলোর স্মৃতি বহন করে। যারা এটিকে আড়াল করেছেন, তাঁদের বিষয়টি নিয়ে সতর্ক হওয়া উচিত। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।”
তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির স্থানীয় প্রতিনিধি মাহবুব আলম বলেন, “নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা প্রায়ই জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে কথা বলেন। অথচ তাঁদের প্রচারণাতেই স্মারকটি ঢেকে দেওয়া হলো, যা প্রত্যাশিত নয়।” তিনি অবিলম্বে ব্যানার ও বিলবোর্ড সরিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটি উন্মুক্ত করার দাবি জানান।
সাংস্কৃতিক কর্মী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণার প্রতিযোগিতায় স্মৃতিস্তম্ভটি ঢেকে যাওয়া দুঃখজনক। শহীদদের স্মৃতি রক্ষা করা শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বও।
বিএনপি ও জামায়াতের বক্তব্য
জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক আহমেদুর রহমান কাজল জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি তাঁদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। কর্মীরা বিষয়টি না বুঝে সেখানে ব্যানার টাঙিয়েছিলেন। তবে তখনও স্মৃতিস্তম্ভটির অনেকটা অংশ দৃশ্যমান ছিল। পরে জামায়াতের ব্যানার ও বিলবোর্ড লাগানোর কারণে সেটি পুরোপুরি ঢেকে যায় বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, জামায়াতের প্রচার বিভাগের প্রতিনিধি মোহাম্মদ শাহজালাল জুয়েল বলেন, স্থানস্বল্পতার কারণে কর্মীরা সেখানে প্রচারসামগ্রী লাগিয়েছেন। অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি তাঁদের পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। ধানের শীষের ব্যানার সরানো হলে তাঁরাও নিজেদের ব্যানার ও বিলবোর্ড সরিয়ে নেবেন বলে জানান তিনি।
স্মৃতিস্তম্ভ উন্মুক্ত করতে প্রশাসনের উদ্যোগ
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না। তবে এ বিষয়ে সকলের আরও সংবেদনশীল ও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।” স্মৃতিস্তম্ভটির চারপাশ থেকে সব ধরনের ব্যানার ও বিলবোর্ড অপসারণে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
৬৪ জেলায় নির্মিত হয় জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগ স্মরণীয় করে রাখতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের ৬৪ জেলায় একই নকশায় জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে। এসব স্মারকে খোদাই করা হয়েছে আন্দোলনের বিভিন্ন স্লোগান, কবিতা ও চিত্রকর্ম। উদ্দেশ্য—ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ও আত্মত্যাগের স্মৃতি তুলে ধরা।
নির্বাচনী প্রচারণার এই ব্যস্ততার মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ আড়াল হয়ে পড়ার ঘটনাটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—রাজনৈতিক প্রচারণার প্রতিযোগিতায় ঐতিহাসিক স্মৃতির মর্যাদা কি উপেক্ষিত হচ্ছে? স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত ব্যানার-বিলবোর্ড সরিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটি সবার জন্য দৃশ্যমান করা হবে।





