
নবীগঞ্জে ‘কাজীর সহকারী’ পরিচয়ে সাহিদ মিয়ার বিরুদ্ধে বিয়ে পড়ানো ও নিকাহ বইয়ে স্বাক্ষর গ্রহণের অভিযোগ
কাজী উপস্থিত না থাকলেও বর-কনে ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর! ‘এস আর স্টুডিও এন্ড গ্রাফিক্স’ ঘিরে সরকারি নথি ও শিক্ষাগত সনদ নিয়ে নানা অভিযোগ
মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী, ক্রাইম রিপোর্টার :
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার ১৩ নম্বর পানিউমদা ইউনিয়নের নোওয়াগাঁও গ্রামের মৃত আব্দুস সালামের ছেলে সাহিদ মিয়াকে ঘিরে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) আবু তাহেরের সঙ্গে সম্পৃক্ততার পরিচয়ে নিজেকে ‘কাজীর সহকারী’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিয়ে পড়ানো, কাজীর অনুপস্থিতিতে নিকাহ বইয়ে বর-কনে ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর নেওয়া এবং রইছগঞ্জ বাজারে অবস্থিত ‘এস আর স্টুডিও এন্ড গ্রাফিক্স’-এর মাধ্যমে পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি-সংক্রান্ত কাজ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়া বিভিন্ন প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষাগত সনদ জাল বা তৈরি করে দেওয়ার অভিযোগও একাধিক সূত্রে পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ ও নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
কাজী উপস্থিত না থাকলেও নিকাহ বইয়ে স্বাক্ষর
সাহিদ মিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একটি স্পষ্ট ভিডিওচিত্র।
প্রাপ্ত ভিডিওতে দেখা যায়, সাহিদ মিয়া নিজেই একটি নিকাহ বইয়ে বর, কনে ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর নিচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ওই সময় লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাজী আবু তাহের ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তারা বিষয়টি নিশ্চিত করলেও নিজেদের নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
ভিডিওতে সাহিদ মিয়ার নিকাহ বইয়ে স্বাক্ষর নেওয়ার দৃশ্য এবং উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে—কাজী ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলে তার সহকারী পরিচয়দানকারী ব্যক্তি কোন দায়িত্ব ও ক্ষমতাবলে নিকাহ বইয়ে বর, কনে ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর গ্রহণ করছিলেন?
আরও প্রশ্ন হলো, ওই বিবাহের নিবন্ধন কার্যক্রম কে সম্পন্ন করেছেন, কাজীর স্বাক্ষর ও সিল কখন দেওয়া হয়েছে এবং নিকাহ রেজিস্টারে ওই বিবাহের তথ্য কীভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে?
আইন কী বলছে, প্রশ্ন উঠছে সহকারীর ক্ষমতা নিয়েও
বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ নিবন্ধনের ক্ষেত্রে Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974 প্রযোজ্য। আইনের ৩ ধারায় মুসলিম আইনের অধীনে সম্পন্ন প্রত্যেক বিবাহ নিবন্ধনের বিধান রয়েছে এবং ৪ ধারায় নির্দিষ্ট এলাকার জন্য সরকার কর্তৃক লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগের কথা বলা হয়েছে।
সাহিদ মিয়া নিজেই বলেন, “আমি কাজী নই, কাজী আবু তাহের আমাকে কোথাও পাঠালে আমি সেখানে গিয়ে বিয়ে পড়াই।”
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, তিনি শুধু বিয়ে পড়াননি; বরং কাজী ঘটনাস্থলে অনুপস্থিত থাকা অবস্থায় নিকাহ বইয়ে বর, কনে ও সাক্ষীদের স্বাক্ষরও গ্রহণ করেছেন। এ বিষয়টি একটি ভিডিওচিত্রে দৃশ্যমান। ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তিও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ফলে এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন হলো—সাহিদ মিয়া যদি কেবল বিয়ে পড়ানোর জন্য কাজীর সহকারী হিসেবে পাঠানো হয়ে থাকেন, তাহলে কাজীর অনুপস্থিতিতে নিকাহ বইয়ে বর-কনে ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর গ্রহণের ক্ষমতা তাকে কে দিয়েছেন এবং সেই ক্ষমতার আইনগত ভিত্তি কী?
এছাড়া ওই নিকাহ বইটি সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রারের রেজিস্টারের অংশ কি না, পরবর্তীতে কাজী নিজে বিবাহটি নিবন্ধন করেছেন কি না এবং রেজিস্টারে কার স্বাক্ষর রয়েছে—এসব নথি যাচাই করাও জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
আইনের ৫(৪) ধারায় ধারা ৫-এর বিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে। তিনি বিবাহ নিবন্ধনের কোনো দায়িত্ব বা ক্ষমতা আইনসঙ্গতভাবে ব্যবহার করেছেন কি না, সেটিই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
সাহিদ মিয়ার বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাহিদ মিয়া বলেন,
“আমি কাজী নই, কাজী আবু তাহের আমাকে কোথাও পাঠালে আমি সেখানে গিয়ে বিয়ে পড়াই।”
নিকাহ বইয়ে বর-কনে ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর নেওয়া এবং অন্যান্য অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন,
“আমি এত আইন জানি না। আপনি কাজী সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন।”
তার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি নিজে কাজী নন এবং কাজী আবু তাহেরের নির্দেশে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে বিয়ে পড়ান।
তবে কাজীর অনুপস্থিতিতে তিনি নিকাহ বইয়ে স্বাক্ষর গ্রহণ করতে পারেন কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো আইনগত ব্যাখ্যা দেননি।
কাজী আবু তাহেরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে কাজী আবু তাহেরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,
“আমি এখন ব্যস্ত, কথা বলতে পারবো না।”
ফলে সাহিদ মিয়াকে কোথায় এবং কী দায়িত্বে পাঠানো হয়, কাজীর অনুপস্থিতিতে নিকাহ বইয়ে স্বাক্ষর গ্রহণের বিষয়টি তিনি জানেন কি না এবং এ ধরনের কার্যক্রমের অনুমোদন তিনি দিয়েছেন কি না—এসব বিষয়ে তার বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
‘এস আর স্টুডিও এন্ড গ্রাফিক্স’ ঘিরে নানা অভিযোগ
এদিকে রইছগঞ্জ বাজারে অবস্থিত ‘এস আর স্টুডিও এন্ড গ্রাফিক্স’ নামের একটি কম্পিউটার ও ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেও সাহিদ মিয়ার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রচারিত বিজ্ঞাপনে বিভিন্ন ডিজিটাল ও প্রিন্টিং সেবার পাশাপাশি পাসপোর্টের কাজ, নতুন ভোটার ও ভোটার তথ্য সংশোধনের আবেদন, নতুন জন্মনিবন্ধন ও জন্মনিবন্ধন সংশোধনের আবেদন করার কথা উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া ফটো প্রিন্ট, পোস্টার-লিফলেট, ডিজিটাল ব্যানার, স্টিকার, জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ স্মরণিকা, মগ প্রিন্ট, ভিজিটিং কার্ড, বিয়ের কার্ড ও বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার কথাও বিজ্ঞাপনে রয়েছে।
তবে এসব সেবার কোনগুলো সাধারণ অনলাইন আবেদন বা ডিজিটাল সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয় এবং কোনগুলোতে সরকারি অনুমোদিত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা হয়—তা স্পষ্ট নয়।
পাসপোর্ট, NID ও জন্মনিবন্ধন নিয়ে অভিযোগ
স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, সাহিদ মিয়া তার স্টুডিওর মাধ্যমে পাসপোর্ট সংশোধন, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) সংশোধন, জন্মনিবন্ধন সংশোধনসহ বিভিন্ন সরকারি নথি-সংক্রান্ত কাজ করে থাকেন।
এসব কাজের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া এবং কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
শিক্ষাগত সনদ জাল করার অভিযোগ
সাহিদ মিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—বিভিন্ন প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট জাল বা তৈরি করে দেওয়ার অভিযোগ।
একাধিক সূত্র দাবি করেছে, সাহিদ মিয়ার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে এবং তার স্টুডিও থেকেই এসব কাজ করা হয়ে থাকে।
সূত্রগুলোর দাবি, সাহিদ মিয়ার ভয়ে অনেকে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি নন।
এক ব্যক্তিকে ঘিরে একাধিক প্রশ্ন
একদিকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাজীর অনুপস্থিতিতে নিকাহ বইয়ে বর-কনে ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর গ্রহণের ভিডিও, অন্যদিকে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথি ও সেবা সংক্রান্ত কাজের বিজ্ঞাপন এবং শিক্ষাগত সনদ জাল করার অভিযোগ—সব মিলিয়ে সাহিদ মিয়ার কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনের কাছে স্থানীয়দের দাবি দ্রুত বিষয়টি তদন্ত পূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. সাহিদ মিয়া সত্যিই কাজী আবু তাহেরের অনুমোদিত সহকারী কি না, তা যাচাই করা। ২. সহকারী হিসেবে তার দায়িত্ব ও ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা। ৩. কাজী অনুপস্থিত থাকলে তিনি নিকাহ বইয়ে বর-কনে ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর নিতে পারেন কি না, তা যাচাই করা। ৪. ভিডিওতে দেখা বিবাহের নিকাহ বই, কাবিননামা ও সংশ্লিষ্ট রেজিস্টারের মূল নথি পরীক্ষা করা। ৫. সাহিদ মিয়ার বিরুদ্ধে কাবিননামা জালিয়াতির কোনো মামলা চলমান থাকলে তার নথি ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করা। ৬. ‘এস আর স্টুডিও এন্ড গ্রাফিক্স’-এর সরকারি সেবা-সংক্রান্ত কার্যক্রমের বৈধতা যাচাই করা। ৭. পাসপোর্ট, NID ও জন্মনিবন্ধন সংশোধনের নামে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্ত করা। ৮. শিক্ষাগত সনদ জাল বা তৈরি করে দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা। ৯. অভিযোগগুলোর সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা থাকলে তাদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা।
অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বিবাহ নিবন্ধন, জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ও শিক্ষাগত সনদ—সবগুলোই নাগরিক জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি। এসব নথি ও সেবা নিয়ে অনিয়ম বা জালিয়াতির অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন বলে দাবি উঠেছে।
জনস্বার্থে এখন মূল প্রশ্ন—লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাজীর দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমার বাইরে গিয়ে কেউ কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করছেন কি না, সরকারি সেবা ও বিবাহ নিবন্ধনের নামে সাধারণ মানুষকে কেউ বিভ্রান্ত বা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছেন কি না এবং এসব কার্যক্রমের পেছনে কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির সহযোগিতা রয়েছে কি না—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





