
অপবাদের আড়ালে যৌতুক, সংসারের ভেতরেই মানবিকতার মৃত্যু
মূল লেখক
মোঃ মিজানুর রহমান
শাখা প্রধান
রূপালী ব্যাংক পিএলসি
পিরোজপুর কর্পোরেট শাখা
।
সংসার মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা। ভালোবাসা, বিশ্বাস ও নির্ভরতার জায়গা হওয়ার কথা। অথচ সেই সংসারেই স্ত্রী নির্যাতন, যৌতুকের দাবি, পরকীয়ার অপবাদ এবং হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি যৌতুকের দাবিতে পরকীয়ার অপবাদ দিয়ে এক স্ত্রীকে হত্যার ঘটনাও সেই নির্মম বাস্তবতাকে আবার সামনে এনেছে। যে মানুষটির কাছে একজন নারী ভালোবাসা ও নিরাপত্তা প্রত্যাশা করেন, সেই মানুষটির হাতেই যদি তাকে সন্দেহ, অপমান ও সহিংসতার শিকার হতে হয়, তাহলে আমাদের সামাজিক অগ্রগতির দাবি কতটা অর্থবহ—সে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
যৌতুক আমাদের সমাজের বহু পুরোনো ব্যাধি। শিক্ষার প্রসার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিংবা আধুনিক জীবনযাত্রার বিস্তার—কিছুই যেন এই কুপ্রথাকে পুরোপুরি নির্মূল করতে পারেনি। বরং এর সঙ্গে যখন পরকীয়ার অপবাদ যুক্ত হয়, তখন তা নির্যাতনের একটি ভয়ংকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। স্ত্রীকে চরিত্রহীন প্রমাণ করতে পারলে তার ওপর অত্যাচার, তাকে ঘরছাড়া করা কিংবা তার মৃত্যুকেও কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যাবে—এমন একটি বিকৃত মানসিকতা কিছু মানুষের মধ্যে কাজ করে। অথচ কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে বিচার করার দায়িত্ব ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার নয়; এটি আইন ও ন্যায়বিচারের বিষয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনা সাধারণত হঠাৎ করে ঘটে না। দীর্ঘদিনের অপমান, অকারণ সন্দেহ, শারীরিক নির্যাতন, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, ফোন তল্লাশি, চলাফেরায় বাধা কিংবা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার মতো আচরণের মধ্য দিয়েই সহিংসতার পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় ‘স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার’ বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। এই নীরবতা নির্যাতনকারীর সাহস বাড়ায় এবং ভুক্তভোগীকে আরও অসহায় করে তোলে।
এখানে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। স্ত্রীকে নিজের সম্পত্তি মনে করা, তার মতামতকে মূল্য না দেওয়া, অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল করে রাখা কিংবা সন্দেহের বশে তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া—এসব কোনোভাবেই দাম্পত্য অধিকার নয়। একইভাবে, কোনো পুরুষ পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হলে তাকেও ন্যায়বিচার ও সুরক্ষা দিতে হবে। কারণ পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান মানে কোনো একটি পক্ষকে অন্ধভাবে সমর্থন করা নয়; বরং নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যৌতুকবিরোধী আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ বিদ্যমান আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রেও আইনানুগ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কারণ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সত্য উদ্ঘাটন ও নিরপেক্ষ তদন্ত—দুটিই অপরিহার্য।
পরিবারের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেয়ের বিয়ে হয়েছে বলেই তার ওপর নির্যাতন মেনে নেওয়া যাবে না। আবার ছেলের পরিবারও ‘সংসার টিকিয়ে রাখার’ নামে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে পারে না। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে—বিয়ে কোনো মালিকানার সম্পর্ক নয়; এটি পারস্পরিক সম্মান, দায়িত্ব ও মর্যাদার বন্ধন। বিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকেও এ বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
একজন স্ত্রীকে হত্যা করা মানে শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবার, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং সমাজের নৈতিক বিবেকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যৌতুকের দাবি, মিথ্যা অপবাদ কিংবা দাম্পত্য নির্যাতন—কোনোটিকেই আর ‘পারিবারিক বিষয়’ বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই।
যে সংসারে ভালোবাসার বদলে ভয় বাসা বাঁধে, সেখানে নীরবতা কোনো সমাধান নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা, নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং অপরাধের বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা—এ দায়িত্ব আমাদের সবার।
সংসার কারও জন্য মৃত্যুফাঁদ হতে পারে না। যে ঘরে ভালোবাসা থাকার কথা, সেখানে ভয় নয়—নিরাপত্তা, সম্মান আর মানবিকতাই হোক শেষ কথা।
পিরোজপুর





