
শীতের আগেই শীতবস্ত্র বিতরণের দাবি গাইবান্ধায়, চরাঞ্চলের মানুষের দুশ্চিন্তা বাড়ছে
গাইবান্ধা থেকে মোঃ আবু জাফর মন্ডলঃ
শীতের আগমনী হাওয়া বইতে শুরু করলেই উত্তরাঞ্চলের জনপদে বাড়তে থাকে শীতের প্রস্তুতি। তবে গাইবান্ধার চরাঞ্চল ও নদীভাঙনকবলিত এলাকার দরিদ্র মানুষের কাছে শীত মানেই বাড়তি দুশ্চিন্তা। কারও ঘরে পুরোনো কাঁথা, কারও ভরসা ছেঁড়া কম্বল; আবার অনেকের শীতের পোশাক কেনার সামর্থ্যও নেই। গ্রামের ভাষায়, ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’—এমন পরিবারের কাছে শীত নিবারণের ব্যবস্থা করা যেন আরেকটি কঠিন লড়াই। তাই শীতের তীব্রতা বাড়ার আগেই অসহায় মানুষের হাতে শীতবস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার দাবি উঠেছে স্থানীয় সচেতন মহলে।
গাইবান্ধার ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও সদর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের দুর্ভোগ প্রতিবছরই প্রকট হয়ে ওঠে শীত মৌসুমে। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে অনেক পরিবারকে অন্যের জমিতে কিংবা অস্থায়ী ঘরে আশ্রয় নিতে হয়। এসব পরিবারের কাছে ঘর মেরামত, দুবেলা খাবার জোগাড় ও সন্তানদের শীতের কাপড় কিনে দেওয়া—সবকিছুই বড় চ্যালেঞ্জ। শীত বাড়লে খড়কুটো জ্বালিয়ে কিংবা পুরোনো কাপড় গায়ে জড়িয়ে রাত পার করার চেষ্টাও করেন অনেকে।
গ্রামবাংলার কৃষিশ্রমিকদের দিন শুরু হয় ভোরের কুয়াশা ভেদ করে। জীবিকার তাগিদে হিমেল হাওয়ার মধ্যেই তাঁদের মাঠে নামতে হয়। কেউ কৃষিকাজ করেন, কেউ নৌকা চালান, আবার কেউ দিনমজুরি করে সংসার চালান। গাইবান্ধা শহরের হাটবাজার ও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রিকশা-ভ্যানচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষেরও দিনের বড় অংশ কাটে খোলা পরিবেশে। তাঁদের কাছে শীতের কাপড় কেনার চেয়ে হাঁড়ির ভাত জোগাড় করাই বেশি জরুরি। ফলে শীতের প্রকোপ বাড়লে দুর্ভোগও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ মানুষের জন্য শীত বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। চরাঞ্চলের অনেক ঘরে পর্যাপ্ত বিছানাপত্র নেই; কোথাও বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢোকে, কোথাও মেঝেতেই কাটে রাত। শহরের ফুটপাত ও খোলা স্থানে রাতযাপন করা ছিন্নমূল মানুষের অবস্থাও নাজুক। স্থানীয়দের মতে, শীত পুরোপুরি জেঁকে বসার পর ত্রাণের অপেক্ষায় না রেখে আগেভাগেই সহায়তা পৌঁছানো প্রয়োজন।
এ অবস্থায় গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন, ব্যবসায়ী এবং সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। প্রথমেই ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক জরিপের মাধ্যমে প্রকৃত শীতার্ত মানুষের তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। ভূমিহীন, দিনমজুর, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, অসহায় প্রবীণ এবং দরিদ্র শিশুদের অগ্রাধিকার দিয়ে কম্বল, চাদর, সোয়েটার ও অন্যান্য শীতবস্ত্র বিতরণের পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।
দুর্গম চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানোও বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু উপজেলা সদর কিংবা শহরের নির্দিষ্ট স্থানে শীতবস্ত্র বিতরণ করলে প্রত্যন্ত এলাকার অনেক পরিবার বাদ পড়তে পারে। তাই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রকৃত উপকারভোগীদের হাতে শীতবস্ত্র তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। নৌপথনির্ভর এলাকায় প্রয়োজনে নৌযানের মাধ্যমে সহায়তা পৌঁছানোর উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে শীতকালীন স্বাস্থ্যসেবা, শিশু ও প্রবীণদের পরিচর্যা এবং ছিন্নমূল মানুষের নিরাপদ রাতযাপনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি প্রবাসী, ব্যবসায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এগিয়ে এলে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিধি আরও বাড়বে।
তবে শীতবস্ত্র বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত অসহায় মানুষ যেন বাদ না পড়েন এবং বরাদ্দের সুবিধা যেন যথাযথভাবে তাঁদের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। লোকদেখানো আয়োজনের পরিবর্তে প্রয়োজনের ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়া হলে শীতার্ত মানুষের উপকার হবে বেশি।
শীত কারও কাছে আনন্দের ঋতু হলেও গাইবান্ধার অসংখ্য দরিদ্র পরিবারের কাছে তা টিকে থাকার সংগ্রাম। গ্রামের মানুষের কথায়, ‘শীতের কামড় যার গায়ে লাগে, সেই বোঝে তার জ্বালা।’ তাই শীতের তীব্রতা বাড়ার পর উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণই হতে পারে কার্যকর পদক্ষেপ।
শীতার্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় এখন সময়ের দাবি। সময়মতো একটি কম্বল কিংবা একখানা গরম কাপড়ও কোনো অসহায় পরিবারের রাতের কষ্ট অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে। মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে সবাই এগিয়ে এলে গাইবান্ধার চরাঞ্চল থেকে শহরের ফুটপাত—কোথাও শীতার্ত মানুষকে একেবারে অসহায় অবস্থায় রাত কাটাতে হবে না—এমন প্রত্যাশাই স্থানীয় সচেতন মহলের।





